Home মতামত ৭১ মানে না। কিন্তু কে ?

৭১ মানে না। কিন্তু কে ?

20
0

সিরাজুল ইসলাম শাহীন।

স্বাধীন বাংলাদেশে ‘৭১ মানে না। কোনভাবেই তা মেনে নেয়া যায় না। সুতরাং রাজনীতিতে ক’দিন তোলপাড়। জামায়াত শিবির কুপোকাতে এই মোক্ষম অস্ত্রটি ব্যাবহৃত হয়ে আসছে বিগত কয়েক যুগ ধরে। মূল বয়ানকারীরা পালিয়ে যাওয়ায় শূন্যস্থান পূরণে বিএনপি যেন মরিয়া। স্থান কাল পাত্র না ভেবে চোখ কান বন্ধ করে মুখস্ত চালিয়ে যাচ্ছেন। অনেকটা ” নিজের নাক কেটে অন্যের যাত্রা ভঙ্গ ” অবস্থা।

প্রশ্ন হচ্ছে, জামায়াত শিবির ‘৭১ মানে না বা স্বাধীনতা মেনে নেয়নি, কিভাবে ? প্রমান কি ? স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন কোন কথা তারা কোন দিন কোথাও বলেন নি, এমন কোন কাজ তারা করেন নি যা থেকে এই অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়। এ বিষয়ে কোন প্রমান কেউ দেখতে পারবেন না। অপেন এই চ্যালেঞ্জটি রয়ে গেছে। তবুও মুখ বন্ধ হয়না। কবি আল মাহমুদের ‘ পন্ডশ্রম ‘ কবিতার যথার্থ চিত্রায়ন যেন।

মুক্তিযুদ্বে জামায়াত বিরোধী পক্ষে ছিল। যা তারা কোনদিন অস্বীকার করেন নি। সকল ওলামায়ে কেরাম, ইসলামী দল সমূহ, পিকিংপন্থী কম্যুনিস্ট এবং পাকিস্তানের ঐক্যপন্থী রাজনৈতিক দলসমুহের সাথে জামায়াত একই পক্ষে ছিল। ১৬ ডিসেম্বর ‘৭১ পরে স্বাধীন বাংলাদেশ তারা মেনে নিয়েছেন। যেমন করে ‘৪৭ এর ভারত বিভক্তির পরে এদেশের একজাতি তত্বের পক্ষের সকলে পাকিস্তান মেনে নিয়েছেন। একইভাবে ভারতে অবস্থানরত দ্বিজাতি তত্বের পক্ষের সকলে ভারত মেনে নিয়েছেন। দুই দেশে আজ পর্যন্ত ঐতিহাসিক এই রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে স্বাধীনতা না মানার তকমা শুনা যায় নি। পৃথিবীর কোন দেশেই এমন নজির নেই। নিকট সময়ের হংকং, আয়ারল্যান্ড এমনকি স্কটল্যান্ডে রাজনৈতিক বিতর্ক ছিল বা আছে। কিন্তু সিদ্ধান্তের পরে সেসব দেশে এমন স্পর্শকাতর পারস্পরিক অপরাজনীতি দেখা যায় না।

বঙ্গবন্ধু ও শহীদ জিয়া এই রীতিতেই ছিলেন। সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। মুসলিম লীগ সভাপতি খান এ সবুর কে মুক্তি দিয়ে সরকারি গাড়িতে সসম্মানে বাসায় পৌছিয়ে দিয়েছিলেন। ১৯৭৯-র নির্বাচনে খুলনার ৩টি আসনে দাঁড়িয়ে সবকটিতে জিতে যিনি তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। ১৯৮২ সালে মৃত্যুর পর সংসদ ভবনের সামনে অবস্থিত জাতীয় গোরস্থানে সমাহিত হন। জামায়াত নেতা সাবেক এম এল এ, মাওলানা আব্দুল আলী ( শহীদ আলী আহসান মুজাহিদের আব্বা ) কে কারাগার থেকে বিশেষ আদেশে মুক্তি দিয়ে পরের দিন ফরিদপুরের কেন্দ্রীয় ঈদগাহের ঈদের জামাতে ইমামতির সুযোগ দিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্বের বিরোধী পক্ষের রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ে শহীদ জিয়া বিএনপি গঠন করেছিলেন। মশিউর রহমান যাদু মিয়া ছিলেন সিনিয়র মন্ত্রী, শাহ আজিজুর রহমান প্রধান মন্ত্রী, মির্জা রুহুল আমিন, মাহমুদুন্নবী চৌধুরী ও আব্দুল আলিম মন্ত্রী। সাবেক রাষ্ট্রপতি ও স্পিকার আব্দুর রহমান বিশ্বাস, সিলেটের শহীদ আলী এডভোকেট, ভোলার এ এম শাহজাহান সহ এ তালিকা অনেক দীর্ঘ। উনারা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত রাজনীতি করে গেছেন। ১৯৭৭ সালে জিয়া ঘোষিত অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী স্বাধীন বাংলাদেশ ও মুক্তিযুদ্ব স্বীকার করে আওয়ামীলীগ, বিএনপি, মুসলিমলীগ সহ সকল রাজনৈতিক দলের মত করে জামায়াতে ইসলামী ১৯৭৯ সালে আনুষ্টানিক কার্যক্রম শুরু করে। সুতরাং জামায়াতের বেলায় বৈধতার প্রশ্ন তোলার কোন নৈতিক অধিকার থাকতে পারে না।

পড়ুনঃ  একটিখুচরাআলাপ

যুদ্বকালীন অপরাধের বিষয়ে বর্তমান আমীরে জামায়াতের ঘোষণাটি প্রণিধান যোগ্য। ” ওই সময়ের কোন অপরাধের সাথে জামায়াত সংশ্লিষ্ট কেউ জড়িত থাকার প্রমান থাকলে আদালতে মামলা হউক। প্রমান থাকলে আমরা সহযোগিতা করব ”- এর পরে এই ইস্যু নিয়ে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের কোন পথ নেই। বিগত ৫০ বছরে জামায়াত নেতৃত্বের বিরুদ্বে কোন বিশ্বাসযোগ্য প্রমান কেউ দিতে পারেন নি। এজন্য সম্পূর্ণ মিথ্যা বানোয়াট মামলা – স্বাক্ষী সাজিয়ে পাপিষ্ট বিচারকদের দিয়ে ব্রিটিশ প্রধান বিচারপতির ভাষায় ,” miscarriage of justice ” ঘটিয়ে নেতৃবৃন্দের ফাঁসী দিতে হয়েছে। দুনিয়ার ইতিহাসের জঘন্যতম এই অবিচারের পর অন্তত ‘৭১-র অপরাধের কালিমার স্পর্শ জামায়াতে ইসলামীর গায়ে চাপিয়ে দেয়ার আর কোন সুযোগ থাকতে পারে না। বরং অপবাদকারী সকল মহলের জামায়াতের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমার দাবি রাজনৈতিক সততার জন্য অপরিহার্য বলা যায়।

এরপরও মুক্তিযুদ্বকালীন গনহত্যা ও নারীধর্ষণ সহ মানবতা বিরোধী অপরাধের বিচারের প্রশ্ন উঠলে দায় তৎকালীন শেখ মুজিব সরকার ও ভারতকে নিতে হবে। কারন স্বাধীনতার পর পর ঘটিত রাষ্ট্রীয় তদন্তে প্রমাণিত ১৯৫ জন অপরাধী পাক সেনা সদস্যদের তারা ছেড়ে দিয়েছিল শিমলা চুক্তি করে। যুদ্বকালীন ইতিহাস বিকৃতির দায়ও সরকার সমূহের। মূলত ভুয়া চেতনা ব্যবসার সুবিধার্থে স্বার্থান্বেষী মহল সত্য উদ্ঘাটনে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। জামায়াতের ঘাড়ে এসব কোন দায় চাপানোর অপচেষ্টা ধোপে ঠিকতে পারে না।

অধিকার আদায়ের লড়াইয়ের ধারাবাহিকতায় এসেছিল ‘৭১ এর মুক্তিযুদ্ব তথা মহান স্বাধীনতা। সুতরাং নাগরিক অধিকার ছিনতাইকারী, ভোট চোর ও চাঁদাবাজ লুটেরা গোষ্ঠীই মূলত স্বাধীনতা বিরোধী। এদের মদদদাতা ” মাফিয়া সিস্টেম তথা ডিপস্টেট ” হচ্ছে আধিপত্ববাদের দালাল ডাকাত চক্র। এরাই ‘৭১ না মানা গোষ্ঠী। যারা ‘২৪ ও মানে না। কারন ‘৭১ ও ‘২৪ এর বৈষম্য বিরোধী চেতনা ওদের মরন যম। এই চেতনার পক্ষের শক্তিশালী সংগঠন তাই চক্ষুশোল।

পড়ুনঃ  প্রবাসী ভোটার তালিকার বিড়ম্বনার অবসান চাই

১৭৫৭ সালের ২৩ জুনের পলাশী ট্রাজেডি উত্তর ” বিভক্তি ও শাসন -শোষনের ” দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় গড়ে উঠা আপাদমস্তক দুর্নীতিগ্রস্থ ” গোটা রাষ্ট্রীয় সিস্টেম ” হচ্ছে জনগনের প্রতিপক্ষ। এরাই ,” দূর্নীতি আমরা করবো না , কাউকে দুর্নীতি করতে দেবো না ” নাগরিক আকাঙ্খার এমন ঘোষণায় আতঙ্কিত হয়ে ম্যাকানিজমে নেমে পড়ে। গড়ে তোলে ফ্যাসিবাদী, নব্য ফ্যাসিবাদী, দুর্নীতিবাজ আমলা – সেনা -পুলিশ -রাজনীতিবিদ,হলুদ মিডিয়া, অভিশপ্ত বাম ও ধর্মীয় লেবাসধারী হিংসুটে -স্বার্থপর গোষ্ঠীর মহাঐক্য। সবাই মিলে আধিপত্ববাদের পদলেহনে যেন প্রতিযোগিতায় নেমেছে। তাই কথায় কথায় ‘৭১ ও ‘২৪ এ বিরোধ খোঁজে, স্বাধীনতা বিরোধী দেখে আর মিথ্যাচারে আবৃত শেখানো বুলি মুখস্ত কবিতার মত বলতে থাকে। কিন্তু তারা জানে না বা জানতে চায় না যে, দিন বদলে গেছে। জনগণ বদলে যাচ্ছে। এই বদলে যাওয়া সচেতন সৎ সাহসী মানুষগুলো নতুন বাংলাদেশ না গড়ে ক্ষান্ত হবে না, ইনশাআল্লাহ।

sirajulislamshaheen@yahoo.com; 30/05/2026; London 03.50.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here