Home বাংলাদেশ এইচআরএসএস মাসিক প্রতিবেদন: মানবাধিকার পরিস্থিতি মে-২০২৬

এইচআরএসএস মাসিক প্রতিবেদন: মানবাধিকার পরিস্থিতি মে-২০২৬

53
0


মে মাসে ৬৪ রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত ৫, আহত ২৮৯

✓মব সহিংসতায় নিহত ৩১, আহত ৬৮
✓নির্যাতনের শিকার ৩০৫ নারী ও শিশু  
✓নির্যাতন ও হয়রানির শিকার ৭৮ সাংবাদিক

চলতি বছরের মে মাসে সারাদেশে রাজনেতিক সহিংসতার ঘটনায় দলীয় কোন্দলে ৫ জন নিহত এবং ২৮৯ জনের অধিক বিভিন্ন দলের নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষ আহত হয়েছেন। 
শুক্রবার (৫ জুন) গণমাধ্যমে প্রেরিত এক সংবাদি বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছেন মানবাধিকার সংগঠন ‘হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি–এইচআরএসএস’।
প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের ১৬ টি জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ এবং হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) এর সংগৃহীত তথ্য ও ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং রিপোর্টের ভিত্তিতে ২০২৬ সালের মে মাসের মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে ৬৪ টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৫ জন এবং আহত হয়েছেন ২৮৯ জন। মে মাসে রাজনৈতিক সহিংসতা ও হতাহতের সংখ্যা এপ্রিল মাসের তুলনায় কমেছে। গত এপ্রিল মাসে ৯৮ টি “রাজনৈতিক সহিংসতার” ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৬ জন এবং আহত হয়েছেন ৫৩৩ জন।
রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় মে মাসে ৬৪ টি ঘটনার মধ্যে বিএনপির অন্তর্কোন্দলে ১৮ টি ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ১১৪ জন। ১০ টি বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ৪৯ জন ও নিহত হয়েছেন ১ জন, ১৪ টি বিএনপি-আওয়ামী লীগের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ৭২ জন ও নিহত হয়েছেন ২ জন। ২ টি বিএনপি-এনসিপি মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ২ জন, ১১ টি বিএনপি-অন্যান্য দলের মধ্যে সংঘর্ষে আহত ২৭ আহত হয়েছেন। বিভিন্ন দলের মধ্যে ০৭ টি ঘটনায় আহত হয়েছেন ২৫ জন । এছাড়া, ২ টি ঘটনায় ইউপিডিএফ এর ২ জন সদস্য নিহত হয়েছেন। নিহত ৫ জনের মধ্যে বিএনপির ১ জন, জামায়াতের ১ জন, পার্বত্য চট্টগ্রাম কেন্দ্রিক রাজনৈতিক দল ইউপিডিএফের ২ জন ও একজন সাধারণ মহিলা।
‘আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ ও হামলা, দলীয় ও অন্তকোন্দল, ও চাঁদাবাজি কেন্দ্রিক অধিকাংশ সহিংসতার ঘটনা ঘটেছ’ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।  এর পাশাপাশি দুষ্কৃতকারীদের দ্বারা রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা-কর্মীদের ওপর হামলার অন্তত ৫ টি ঘটনায় কমপক্ষে ৭ জন আহত এবং ১ নিহত হয়েছেন । অন্তত ১১ জন রাজনৈতিক নেতা-কর্মী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। এছাড়াও সারাদেশে আধিপত্য বিস্তার, দখলদারিত্ব, রাজনৈতিক সহিংসতা ও চাঁদাবাজি কেন্দ্রীক ৮ টি ঘটনায় অন্তত ১৩৪ টি বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠা, দলীয় কার্যালয়ে সংঘর্ষ, হামলা, লুটপাট, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।
এছাড়া, এমাসে বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের নামে ২৩ টির অধিক মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ৪০৫ জনের নাম উল্লেখ করে এবং আরও প্রায় ৯৩২ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। এছাড়া, একই মাসে রাজনৈতিক ও অন্যান্য মিলিয়ে মোট ২১২টি ঘটনায় অন্তত ৩৩১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে আওয়ামী লীগের অন্তত ২৪৬ জন নেতাকর্মী, বিএনপির ৬৪ জন, জামায়াতে ইসলামির ১২ জন, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ৯ সদস্য রয়েছেন। এছাড়া সারাদেশে যৌথবাহিনীর বিশেষ অভিযানে ১,৯৩৫ জনেরও বেশি ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের অধিকাংশই আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও উগ্রপন্থী সংগঠনের সদস্য। 
মব সহিংসতা ও গণপিটুনীর ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, এ মাসে গণপিটুনী ও মব সহিংসতায় সারাদেশ চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, বাক-বিতন্ডা, আধিপত্য বিস্তার, ধর্মীয় অবমাননাসহ নানা অভিযোগে ৬৬ টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন অন্তত ৩১ জন এবং আহত হয়েছেন ৬৮ জন।
মে মাসে সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনার তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়েছে, মে মাসে ৩৯ টি ঘটনায় ৭৮ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এ সকল ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্ততপক্ষে ৪২ জন, লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন ১৮ জন, হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন ০৯ জন সাংবাদিক। ১ জন সাংবাদিককে আটক করা হয়েছে। এছাড়া ২ টি মামলায় ৮ জন সাংবাদিককে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
সভা সমাবেশ ও মত প্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, এ মাসে ১০ টি সভা ও সমাবেশ আয়োজনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বাধা প্রদান করে, এতে ৪১ জনের অধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন।  
এছাড়া এ মাসে মত প্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের ঘটনা পূর্বের মাসের ন্যায় ছিলো। এ মাসে অন্তত ১১ টি ঘটনায় ০৬ জনকে আটক ও ৭ টি মামলা দায়ের হয়েছে। এসব মামলায় অন্তত ১২ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সমালোচনা করে ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ায় ১ জন, ক্ষমতাসীন দল বিএনপির নেতাকর্মীদের সমালোচনায় ৬ জন, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও কটুক্তির অভিযোগে ২ জন এবং অন্যান্য ইস্যুতে ০১ জনকে আটক করা হয়েছে।  অন্যদিকে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫-এর বিভিন্ন ধারার অধীনে পৃথক ৫ টি মামলায় ১২ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
বিচার বহির্ভূত হত্যা, থানা ও কারাগারে মৃত্যুর বিষয়ে সংস্থাটির পক্ষ থেকে উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ, ভিকটিমের পরিবার ও এইচআরএসএস এর সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, গত ১৮ মে ‍সুন্দরবনের খুলনা রেঞ্জের শতমুখী খাল এলাকায় বনবিভাগের কর্মকর্তা কর্তৃক গুলিবিদ্ধ হয়ে ১জন ও মাদক বিরোধী অভিযানের সময় পালাতে গিয়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে।
এছাড়া, এ মাসে সারাদেশে কারাগারে কমপক্ষে ৭ জন আসামী মারা গিয়েছেন । এর মধ্যে ৪ জন জন কয়েদী ও ৩ জন হাজতী। এর মধ্যে ১ জন আওয়ামী লীগের ৬ জন জন্য সাধারণ কয়েদী মারা গেছেন।
ধর্মীয় সংখ্যালঘু নির্যাতন ও মাজারে হামলার ঘটনার উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ মাসে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর ৩ টি হামলার ঘটনায় ৫ জন আহত হয়েছে। এছাড়া ৬ টি বসতবাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর এবং ১টি ভূমি দখলের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া কুষ্টিয়া ও ঢাকায় পৃথক ২ টি মাজারে হামলার ঘটনা ঘটেছে, এসময়ে বেশ কয়েকজন আহত হন।
সীমান্তে হতাহত ও আটকের ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে এইচআরএসএসের প্রতিবেদনা বলা হয়, মে মাসে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ০৬ টি হামলার ঘটনায় ৬ জন নিহত ও ২০ জন আহত হয়েছে, এদের মধ্যে ৩ জন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। তাছাড়া বিএসএফ কর্তৃক ১৪ জনকে আটক করা হয়েছে।
অপরদিকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে পুতে রাখা স্থলমাইন বিষ্ফোরনে ৩ জন নিহত ও ১ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া ৪ টি ঘটনায় ১৮ জনকে আটক করেছেন আরাকান আর্মি।
শ্রমিক নির্যাতনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয় উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মে মাসে ৫৭ টি শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২০ জন এবং আহত হয়েছেন ১৩০ জন। এছাড়া অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং শ্রমিকদের সুরক্ষামূলক সরঞ্জামের অভাবে দুর্ঘটনায় ৪১ জন শ্রমিক তাদের কর্মক্ষেত্রে মারা গেছেন।

পড়ুনঃ  এইচআরএসএস’ এর মাসিক মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন প্রকাশ

এ মাসে ৩০৫ জন নারী ও কন্যা শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, মে মাসে ৮৩ জন নারী, শিশু ও কিশোরী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৫৭ জন ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু ও কিশোরী। ১৭ জন নারী ও কন্যা শিশু গণধর্ষনের শিকার হয়েছেন । অন্যদিকে ৭৬ জন নারী ও কন্যা শিশু যৌন নিপীড়ণের শিকার হয়েছেন তন্মধ্যে শিশু ৪২ জন। যৌতুকের জন্য নির্যাতনের ঘটনায় নিহত ৩, আহত ৪, এবং আত্মহত্যা করেছেন ১ জন নারী। পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন ৬৩ জন, আহত হয়েছেন ৩১ জন এবং আত্মহত্যা করেছেন ৪৫ জন নারী। এছাড়া, এসিড নিক্ষেপের ঘটনায় আহত হয়েছেন ১ জন।

অন্যদিকে, এটি উদ্বেগজনক যে, অন্তত ২১৫ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন যাদের মধ্যে ৫৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং ২১১ জন শিশু শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

সার্বিক বিষয়ে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, মাসজুড়ে রাজনৈতিক সহিংসতা, গণপিটুনী ও মব সহিংসতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, সাংবাদিক নির্যাতন, নারী ও শিশু নির্যাতন, সীমান্তে সহিংসতা, শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনার ধারাবাহিকতা রয়েছে। তবে এ মাসে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মতামত প্রকাশকে কেন্দ্র করে গ্রেফতার, হয়রানি ও আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এসব বিষয় সমাধান করা না হলে মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে।
এসময় সরকারের প্রতি মানবাধিকার রক্ষায় আরও জবাবদিহিমূলক ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানানোর পাশাপাশি সকল নাগরিক, গণমাধ্যমকর্মী, নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার সংগঠনের প্রতি এইচআরএসএসের পক্ষ থেকে অধিক সোচ্চার ও সক্রিয় ভূমিকা পালনের অনুরোধ জানান তিনি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here