Home সম্পাদকীয় কাজী নজরুল ইসলাম: ক্ষুধা, সংগ্রাম, সাম্য ও বিদ্রোহের কবি

কাজী নজরুল ইসলাম: ক্ষুধা, সংগ্রাম, সাম্য ও বিদ্রোহের কবি

42
0



এক — একটি কণ্ঠস্বরের জন্ম
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কিছু কবি এসেছিলেন শব্দ নিয়ে, কিছু কবি এসেছিলেন ছন্দ নিয়ে। কিছু কবি এসেছিলেন শব্দ ও ছন্দ- উভয় নিয়ে। কিন্তু কাজী নজরুল ইসলাম এসেছিলেন আগুন নিয়ে। তাঁর কলম ছিল অস্ত্র, তাঁর কবিতা ছিল বিদ্রোহের ইস্তেহার, তাঁর গান ছিল শৃঙ্খলমুক্তির আহ্বান। তিনি কেবল একজন কবি ছিলেন না — তিনি ছিলেন একটি যুগ, একটি আন্দোলন, একটি জাগরণ।
রবীন্দ্রনাথের পর বাংলা কবিতার যে বিশাল আকাশ, সেখানে নজরুল উঠলেন এক অন্য নক্ষত্র হয়ে — উজ্জ্বল, উদ্ধত, অপ্রতিরোধ্য। রবীন্দ্রনাথ যেখানে সৌন্দর্যের ভেতর সত্যকে খুঁজেছেন, নজরুল সেখানে সত্যকে আঘাতে আঘাতে উন্মোচন করেছেন। রবীন্দ্রনাথ নিজেই স্বীকার করেছিলেন, নজরুলের মধ্যে এমন একটি শক্তি আছে যা বাংলা সাহিত্যে আগে ছিল না। “আয় চলে আয় রে ধূমকেতু” — এই ডাক দিয়ে নজরুল নিজেকে পরিচয় দিয়েছিলেন সেই ধূমকেতু হিসেবে, যে আসে আলো নিয়ে, আসে ধ্বংস নিয়ে, কিন্তু আসে সত্যকে উন্মুক্ত করে দিতে।
তাঁকে বুঝতে হলে শুধু তাঁর কবিতা পড়লেই হয় না — তাঁর জীবনকেও পড়তে হয়। কারণ তাঁর প্রতিটি পংক্তির ভেতরে লুকিয়ে আছে তাঁর নিজের জীবনের ক্ষত, ক্ষোভ এবং স্বপ্ন।
দুই — চুরুলিয়ার মাটি থেকে
১৮৯৯ সালের ২৪ মে, বর্ধমান জেলার প্রত্যন্ত গ্রাম চুরুলিয়ায় এক দরিদ্র মসজিদের ইমামের ঘরে জন্ম নেন কাজী নজরুল ইসলাম। বাবা কাজী ফকির আহমদ ছিলেন মসজিদের ইমাম ও মাজারের খাদেম। পরিবারে ধর্মের আলো ছিল, কিন্তু সংসারে অন্নের আলো ছিল সবসময় নয়।
মাত্র আট বছর বয়সে পিতার মৃত্যু নজরুলের শৈশব কেড়ে নিল। সংসারের ভার এল কাঁধে। তিনি মসজিদে মুয়াজ্জিনের কাজ করলেন, মক্তবে পড়ালেন, লেটো গানের দলে যোগ দিলেন — সেই লেটো দলেই প্রথম ফুটল তাঁর সৃষ্টিশীলতার বীজ। বাসুদেব, শকুনিবধ, মেঘনাদবধের মতো পালা রচনা করলেন মাত্র নয়-দশ বছর বয়সে। গ্রামের মানুষ অবাক হলো — এই ছেলের মাথায় আগুন আছে।
পরে রুটির দোকানে কাজ করেছেন, আসানসোলে মোহাম্মদ আলীর রুটির দোকানে। রান্না করেছেন, বেলেছেন — কিন্তু কলমও থামেনি। ১৯১৭ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষা না দিয়েই সেনাবাহিনীতে যোগ দিলেন। ৪৯ নম্বর বাঙালি পল্টনে যোগ দিয়ে করাচি থেকে করাচি হয়ে জীবন দেখলেন ভেতর থেকে — সৈনিকের চোখে।
করাচি সেনানিবাসে বসে তিনি পড়লেন রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র। পড়লেন রুমি, হাফিজ, ওমর খৈয়াম। বাংলা ও ফারসি সাহিত্যের এই দুই ধারা তাঁর চেতনায় মিলে গেল এক অদ্ভুত সংগীতে।
তিন — “বিদ্রোহী”: একটি কবিতা, একটি বিস্ফোরণ
১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাস। কুমিল্লা থেকে ফিরে কলকাতায় বসে একরাতেই লিখলেন “বিদ্রোহী”। ১৯২২ সালের ৬ জানুয়ারি সাপ্তাহিক বিজলী পত্রিকায় ছাপা হলো কবিতাটি। এরপর যা হলো তা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে বিরল।
পত্রিকার সব কপি একদিনেই শেষ। পত্রিকা বারবার পুনর্মুদ্রণ করতে হলো। মানুষ রাস্তায় দাঁড়িয়ে পড়ল, কফিখানায় পড়ল, বাড়িতে পড়ল — আর শিউরে উঠল।
“বল বীর — বল উন্নত মম শির! শির নেহারি আমারি, নতশির ওই শিখর হিমাদ্রির!”
এই কবিতায় নজরুল নিজেকে একে একে ঘোষণা করলেন — আমি ব্রহ্মা, আমি বিষ্ণু, আমি শিব, আমি চির-বিদ্রোহী, আমি দুর্বার। হিন্দু পুরাণ, ইসলামী ঐতিহ্য, গ্রিক পুরাণ — সবকিছুকে একটি মহাকাব্যিক আমিতে মিলিয়ে দিলেন। এটি কোনো অহংকার নয় — এটি শতবছরের পরাধীন এক জাতির জেগে ওঠার চিৎকার।
রবীন্দ্রনাথ এই কবিতা পড়ে বললেন — “এ কবিতা অমর হবে।”
কিন্তু বিদ্রোহ কেবল “বিদ্রোহী” কবিতায় সীমিত ছিল না। নজরুলের প্রতিটি রচনায় ছিল সেই একই আগুনের হলকা — কখনও মৃদু, কখনও প্রচণ্ড।
“আমি সেই দিন হব শান্ত, যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে-বাতাসে ধ্বনিবে না, অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না।”
চার — ধূমকেতু, অগ্নিবীণা এবং কারাবরণ
১৯২২ সালেই নজরুল প্রকাশ করলেন অগ্নিবীণা — বাংলা কবিতার ইতিহাসে এক বিপ্লব। এই কাব্যগ্রন্থের “প্রলয়োল্লাস”, “আগমনী”, “কামাল পাশা”, “রণভেরী” — প্রতিটি কবিতা ছিল ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে এক একটি কামানের গোলা।
“তোরা সব জয়ধ্বনি কর! তোরা সব জয়ধ্বনি কর! ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কালবোশেখির ঝড়!”
একই বছর তিনি সম্পাদনা শুরু করলেন ধূমকেতু পত্রিকার। পত্রিকার শিরে ছিল রবীন্দ্রনাথের আশীর্বাণী। নজরুল লিখলেন ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি — যা তখনও অনেক নেতাও প্রকাশ্যে বলতে সাহস করতেন না।
২৬ সেপ্টেম্বর ১৯২২, ধূমকেতু-তে প্রকাশিত হলো “আনন্দময়ীর আগমনে” কবিতা। এতে ব্রিটিশ শাসনকে এমনভাবে আক্রমণ করা হলো যে ঔপনিবেশিক সরকার তাৎক্ষণিক পত্রিকা বাজেয়াপ্ত করল।
নজরুলকে গ্রেফতার করা হলো। বিচারে রাজদ্রোহের অভিযোগে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হলো। প্রেসিডেন্সি জেলে বন্দী নজরুল দেখলেন ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের অমানবিক ব্যবহার। তিনি অনশন শুরু করলেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে টেলিগ্রাম করলেন: “Give up hunger strike, our literature claims you.”
অনশন ভাঙলেন। কিন্তু বিদ্রোহ ভাঙলেন না।
পাঁচ — ক্ষুধার ভাষা, দারিদ্র্যের কবিতা
নজরুলের কবিতায় ক্ষুধা একটি বিমূর্ত রূপক নয় — এটি জীবন্ত, দেহজ, বেদনাময়। কারণ তিনি ক্ষুধা দেখেননি শুধু — তিনি ক্ষুধা পেয়েছেন।
“হে দারিদ্র্য, তুমি মোরে করেছ মহান! তুমি মোরে দানিয়াছ খ্রিস্টের সম্মান কণ্টক-মুকুট শোভা — দিয়াছ, হে মহান!”
— দারিদ্র্য, সঞ্চিতা
এই কবিতায় যিশুখ্রিষ্টের কাঁটার মুকুটের প্রতিমা ব্যবহার করে নজরুল দেখালেন — দারিদ্র্য মানুষকে ভাঙে না, ক্রুশে চড়িয়ে সে তাকে মহান করে। এটি নিছক সান্ত্বনার কথা নয়; এটি এক গভীর দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি — যে ব্যথা সহ্য করতে পারে, সে-ই ইতিহাস লেখে।
“কুলি-মজুর” কবিতায় তিনি সরাসরি শ্রমজীবী মানুষের পক্ষে দাঁড়ালেন:
“দেখিনু সেদিন রেলে, কুলি বলে এক বাবু সা’ব তারে ঠেলে দিল নিচে ফেলে! চোখ ফেটে এলো জল, এমনি করে কি জগৎ জুড়িয়া মার খাবে দুর্বল?”
এই একটি কবিতায় নজরুল যা বললেন, তা তখনকার কোনো রাজনীতিবিদও এত সরাসরি বলেননি। শ্রেণি-বৈষম্যের এই ছবি এত তীক্ষ্ণ, এত বাস্তব — কারণ এটি তত্ত্ব থেকে নয়, জীবন থেকে উঠে এসেছে।
“ফরিয়াদ” কবিতায় তিনি লিখলেন:
“মসজিদেরই পাশে আমার কবর দিও ভাই, যেন গোরে থেকেও মোয়াজ্জিনের আজান শুনতে পাই।”
এই কবিতা শুধু ধর্মীয় আকুতির নয় — এটি একজন মানুষের শিকড়ের সঙ্গে চিরসংযুক্ত থাকার আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ।
ছয় — সাম্যের দর্শন: মানুষ সবার আগে
নজরুলের সাহিত্যের সবচেয়ে বৈপ্লবিক দিক হয়তো তাঁর সাম্যের দর্শন। তিনি মার্কসবাদী ছিলেন না, আবার গান্ধীপন্থীও নন। তিনি ছিলেন নজরুলপন্থী — এক অনন্য মানবতাবাদী, যাঁর কাছে মানুষই সর্বোচ্চ সত্তা।
১৯২৫ সালে প্রকাশিত সাম্যবাদী কাব্যগ্রন্থে তিনি লিখলেন:
“গাহি সাম্যের গান — মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান। নাই দেশকাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্মজাতি, সব দেশে, সব কালে, ঘরে-ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।”
এই কাব্যগ্রন্থের “মানুষ” কবিতাটি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রচনা:
“গাহি সাম্যের গান — জাত-পাত-ধর্মের ঊর্ধ্বে মানুষ সবার আগে। মসজিদে দেখি কাবার ঘরে, মন্দিরে দেখি বুদ্ধ, চার্চে দেখি খ্রিস্ট — কিন্তু মানুষ কোথায় লুকালো? যার তরে এই তীর্থধাম, সে কি পথে পথে কাঁদে না?”
নজরুল বললেন — ধর্মের মন্দিরে-মসজিদে দেবতা আছে, কিন্তু মানুষ নেই। প্রকৃত ধর্ম হলো মানুষকে দেখা। এই দর্শন তাঁকে করে তুলেছিল তৎকালীন রক্ষণশীল ধর্মীয় মহলের চক্ষুশূল।
“কাণ্ডারী হুঁশিয়ার” কবিতায় হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের যে আবেদন, তা আজও অপ্রতিম:
“হিন্দু না ওরা মুসলিম? ওই জিজ্ঞাসে কোন জন? কাণ্ডারী! বল, ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মার।”
ডুবন্ত মানুষের পরিচয় জানতে চাওয়া — এর চেয়ে বড় সাম্প্রদায়িকতার সমালোচনা আর কী হতে পারে?
সাত — নারীর পক্ষে, প্রেমের পক্ষে
নজরুল ছিলেন তাঁর কালের অন্যতম সাহসী নারীবাদী কণ্ঠস্বর। এমন এক সময়ে, যখন নারীর অধিকার বলতে প্রায় কিছুই ছিল না, তিনি লিখলেন “নারী” কবিতা:
“সাম্যের গান গাই — আমার চক্ষে পুরুষ-রমণী কোনো ভেদাভেদ নাই! বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।”
এই ঘোষণা ১৯২৫ সালের — যখন নারীর ভোটাধিকারও ছিল না ভারতে। নজরুল বললেন — ইতিহাসের অর্ধেক কৃতিত্ব নারীর, তাঁদের অস্বীকার করলে ইতিহাস অর্ধেক মিথ্যা হয়ে যায়।
প্রেমের কবিতায় নজরুল আবার সম্পূর্ণ ভিন্ন — কোমল, আকুল, মানবিক। “বেলা শেষের গান”, “বিরহ”, “মরণ” — এই কবিতাগুলো পড়লে মনে হয় এই মানুষটি একই সঙ্গে কতটা শক্ত এবং কতটা নরম।
প্রমীলা দেবীকে বিয়ে করলেন হিন্দু-মুসলিম সীমানা অতিক্রম করে — যা তখনকার সমাজে সাহসের চেয়ে বড় বিদ্রোহ। সমালোচনা এলো দুদিক থেকেই। নজরুল পরোয়া করলেন না।
আট — ইসলামী সাহিত্য এবং সাংস্কৃতিক সমন্বয়
নজরুল বাংলা সাহিত্যে এক অভূতপূর্ব সংযোজন ঘটালেন — মুসলিম সভ্যতার বিশাল ঐতিহ্যকে বাংলার মাটিতে প্রোথিত করলেন।
তাঁর মরুভাস্কর কাব্যগ্রন্থে হজরত মুহম্মদ (সা.)-এর জীবনকে কেন্দ্র করে লিখলেন মহাকাব্যিক পর্যায়ের কবিতা। কারবালার ইতিহাসকে নিয়ে লিখলেন “মহররম”:
“নীল সিয়া আসমান, লাল বে-দিগন্ত জমিন, ইয়া মুহাম্মদ! ইয়া আলী! ইয়া হোসেন আমিন!”
— মহররম
হাফিজ, রুমি, ওমর খৈয়ামের কবিতার বঙ্গানুবাদ করলেন — ফারসি সাহিত্যের সৌন্দর্যকে বাংলাভাষীদের সামনে উন্মুক্ত করে দিলেন। অথচ একই নজরুল লিখলেন শ্যামাসংগীত, কীর্তন, ভক্তিগীতি। শিব, কালী, দুর্গা, রাধা-কৃষ্ণ — সবাই তাঁর কলমে সমান ভক্তি পেলেন।
এই সাংস্কৃতিক সমন্বয় কোনো কৌশলগত আপোষ ছিল না। এটি ছিল নজরুলের মূল বিশ্বাস — মানুষ এক, তার সাধনাও এক, কেবল পথ ভিন্ন।
নয় — গান: এক সমান্তরাল সাম্রাজ্য
নজরুলের গান তাঁর কবিতার চেয়ে কম বৈপ্লবিক নয়। তিনি প্রায় চার হাজার গান রচনা করেছেন — যা বাংলা সংগীতের ইতিহাসে এক অতুলনীয় অবদান।
“নজরুলসংগীত” আজ একটি স্বতন্ত্র সংগীত-ঘরানা। তাঁর গানে আছে দেশপ্রেম (“চল চল চল”), প্রেম (“ভুলি কেমনে”), বিরহ (“বনের হরিণ”), ভক্তি (“আল্লাহ আমার রব”), এবং প্রকৃতি (“মোর ঘুম ঘোরে এলে মনোহর”)।
“চল চল চল” গানটি আজ বাংলাদেশের রণসংগীত:
“চল চল চল! ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল, নিম্নে উতলা ধরণী-তল, অরুণ-প্রাতের তরুণ দল চল রে চল রে চল।”
এই গান শুনলে বোঝা যায় কেন নজরুল শুধু কবি নন — তিনি একটি আন্দোলনের সুর।
দশ — নীরবতার তিন দশক
১৯৪২ সাল। নজরুলের বয়স মাত্র তেতাল্লিশ। হঠাৎই তাঁর কণ্ঠ থেমে গেল, কলম থেমে গেল, স্মৃতি ঝাপসা হয়ে গেল। চিকিৎসকেরা নির্ণয় করলেন — Pick’s Disease, এক দুরারোগ্য স্নায়বিক ব্যাধি।
বাকশক্তিহীন, স্মৃতিভ্রষ্ট নজরুল পরবর্তী চৌত্রিশ বছর কাটালেন প্রায় এক নিশ্চেতন অস্তিত্বে। যে কণ্ঠ বলেছিল “বল বীর — চির-উন্নত মম শির” — সেই কণ্ঠ নীরব। ইতিহাসের এই নিষ্ঠুর বৈপরীত্য বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে মর্মান্তিক অধ্যায়গুলোর একটি।
কিন্তু যা তিনি লিখে গিয়েছিলেন, তা কেউ থামাতে পারেনি।
১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের আমন্ত্রণে তাঁকে ঢাকায় আনা হলো। বাংলাদেশ তাঁকে জাতীয় কবির মর্যাদা দিল। বাংলাদেশ সরকার তাঁকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করল।
১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। তাঁর ইচ্ছামতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে সমাহিত করা হলো — যেন মোয়াজ্জিনের আজানের সঙ্গেই তিনি চিরকাল থাকেন।
এগারো — আজকের নজরুল
আজ, একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে নজরুলকে পড়লে মনে হয় তিনি আজকের কথাই লিখেছিলেন।
যেখানে ধর্মকে ব্যবহার করা হচ্ছে বিদ্বেষ ছড়াতে, নজরুল বলছেন — “হিন্দু না ওরা মুসলিম? ওই জিজ্ঞাসে কোন জন?” যেখানে শ্রমজীবী মানুষ এখনও শোষিত, নজরুল বলছেন — “দেখিনু সেদিন রেলে…” যেখানে নারী এখনও বৈষম্যের শিকার, নজরুল বলছেন — “অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।”
আজকের বাঙালিদের জন্য নজরুল অতীতের স্মৃতি নন — তিনি একটি জীবন্ত আলো। তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন যে ভিন্নতার মধ্যে ঐক্য সম্ভব, শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো সম্ভব, এবং ক্ষুধার মধ্যেও স্বপ্ন দেখা সম্ভব।
তাঁর ভাষাতেই শেষ করা যাক —
“আমি জগতের কবি, পথের কবি — যেথায় দেখি অত্যাচার, সেথায় জ্বালি আলো। শোনো শোনো, ভোলো না কেউ — আমরাই বিদ্রোহী, আমরাই নবীন।”
নজরুলের বিদ্রোহ শেষ হয়নি। তাঁর গান থামেনি। কারণ যতদিন পৃথিবীতে অন্যায় আছে, ততদিন নজরুলের কণ্ঠ প্রাসঙ্গিক — উদ্ধত, উজ্জ্বল, অপ্রতিরোধ্য।

লেখক-সুমন মাহমুদ
গবেষক ও লেখক
সদস্য, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম ইনিস্টিটিউট, ঢাকা

তথ্যসূত্র ও পাঠসহায়িকা: রফিকুল ইসলাম রচিত ‘নজরুল-জীবনী’; মুস্তাফা নূরউল ইসলামের ‘নজরুল-প্রতিভা’; অগ্নিবীণা (১৯২২), সঞ্চিতা (১৯২৫), সাম্যবাদী (১৯২৫), মরুভাস্কর — কাজী নজরুল ইসলাম রচিত মূল গ্রন্থ।

পড়ুনঃ  রানীগঞ্জে গণহত্যার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি চান শহীদ সন্তান আকবর হোসেন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here