Home বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের অবসান, ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের আহ্বান: এইচআরএসএস-এর ১২তম জাতীয়...

রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের অবসান, ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের আহ্বান: এইচআরএসএস-এর ১২তম জাতীয় মানবাধিকার সম্মেলন অনুষ্ঠিত

27
0

ঢাকা: ২৭ জুন

হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) আয়োজিত ১২তম জাতীয় মানবাধিকার সম্মেলন–২০২৬ আজ রাজধানীর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ইসফানদিয়ার জাহান হাসান চৌধুরী মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়েছে। “Empower Youth, Secure Rights” প্রতিপাদ্যে আয়োজিত এ সম্মেলনে দেশের মানবাধিকার কর্মী, আইনজীবী, বিচারবিদ, গবেষক, সাংবাদিক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, উন্নয়নকর্মী, বিভিন্ন জেলার মানবাধিকার প্রতিনিধি এবং নির্যাতনের শিকার ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা অংশগ্রহণ করেন।
দিনব্যাপী সম্মেলনের উদ্বোধনী পর্বে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর স্বাগত বক্তব্য ও সংগঠনের পরিচিতি তুলে ধরেন এইচআরএসএস-এর নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম। সংগঠনের ২০২৫ সালের কার্যক্রম পর্যালোচনা উপস্থাপন করেন প্রোগ্রাম অফিসার মো. সাইফুল ইসলাম। ডকুমেন্টেশন অফিসার আব্দুল কাদের বাংলাদেশের বার্ষিক মানবাধিকার পরিস্থিতি ২০২৫ শীর্ষক প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। একই পর্বে প্রোগ্রাম অফিসার সানী কুদরত সাকী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট–২০২৬ বিষয়ক মনিটরিং প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। অংশগ্রহণকারীদের উন্মুক্ত আলোচনার পাশাপাশি সংগঠনের ভবিষ্যৎ কার্যক্রম নিয়েও আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
উদ্বোধনী অধিবেশনে বক্তারা বলেন, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকের জীবন, স্বাধীনতা ও মানবিক মর্যাদা রক্ষা করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও আন্তর্জাতিক দায়িত্ব। কিন্তু বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, হেফাজতে নির্যাতন, রাজনৈতিক সহিংসতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং সীমান্তে প্রাণহানির মতো ঘটনাগুলো মানবাধিকার পরিস্থিতিকে গভীরভাবে উদ্বেগজনক করে তুলেছে। এসব ঘটনার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কার্যকর তদন্ত, বিচার এবং জবাবদিহিতার অভাব দায়মুক্তির সংস্কৃতিকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে বলে বক্তারা মন্তব্য করেন।
সম্মেলনের বিশেষ অধিবেশনে “রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন: ভুক্তভোগীর অভিজ্ঞতা, ন্যায়বিচার এবং জবাবদিহিতার প্রশ্ন” শীর্ষক প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন ব্যারিস্টার সারা হোসেন, মো. নূর খান, সানজিদা ইসলাম এবং অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির। রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের শিকারে নিহত ইশতিয়াক হোসেন জনির ভাই ইমতিয়াজ হোসেন রকি ও পুলিশের গুলিতে পা হারানো সাতক্ষীরার রুহুর আমিন বক্তব্য দেন। অধিবেশনটি সঞ্চালনা করেন এইচআরএসএস-এর নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম।
এই অধিবেশনে রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের শিকার ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা তাঁদের বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। নিখোঁজ ব্যক্তির স্বজন, আহত আন্দোলনকারী এবং নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিরা বলেন, বিচারহীনতা কেবল একটি আইনি সংকট নয়; এটি ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানসিক দুর্ভোগের কারণ। তাঁরা সত্য উদ্ঘাটন, স্বাধীন তদন্ত, ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন এবং দায়ীদের বিচারের মাধ্যমে রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান।
আলোচনায় বক্তারা বলেন, নির্যাতনবিরোধী জাতিসংঘ কনভেনশনসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকার বাস্তবায়নে আরও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রমে স্বচ্ছতা, স্বাধীন তদন্ত ব্যবস্থা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক বিচারপ্রক্রিয়া নিশ্চিত না হলে টেকসই মানবাধিকার সুরক্ষা সম্ভব নয়।
পরবর্তী অধিবেশনে “সীমান্তে নিরাপত্তা ও মানবাধিকার” শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন মানবাধিকার কর্মী সাজ্জাদ হোসেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক সাইফুদ্দিন আহমেদ। এছাড়া সীমান্তে নিহতদের পরিবারের সদস্য ফেলানী খাতুনের বাবা নুর ইসলাম ও নিহত মুরসালিনের বড় ভাই ইয়াসিন মিয়া তাঁদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।
বক্তারা বলেন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা অবশ্যই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও মানবিক নীতিমালার আলোকে পরিচালিত হতে হবে। অনিয়মিত অভিবাসন বা সীমান্ত অতিক্রমের অভিযোগে কাউকে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা কিংবা যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া সীমান্তে ফেরত পাঠানো মানবাধিকারের মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সীমান্তে প্রাণহানি বন্ধে কার্যকর দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং মানবাধিকারভিত্তিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
সম্মেলনের অতিথি বক্তৃতা পর্বে বক্তব্য দেন জাতিসংঘ মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের বাংলাদেশ অফিসের মানবাধিকার কর্মকর্তা মো. জাহিদ হোসেন, সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর পরিচালক (যুগ্ম সচিব) ব্যারিস্টার মো. খলিলুর রহমান খান এবং অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি বাংলাদেশ হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি ও গুম তদন্ত কমিশনের সাবেক সভাপতি বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী।
বক্তারা বলেন, মানবাধিকার রক্ষা কোনো রাজনৈতিক ইস্যু নয়; এটি প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার এবং রাষ্ট্রের অপরিহার্য দায়িত্ব। অতীতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, সত্য উদ্ঘাটন এবং দায়ীদের বিচারের মাধ্যমে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারের নিরাপত্তা, আইনি সহায়তা, পুনর্বাসন এবং মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা নিশ্চিত করার জন্য একটি কার্যকর জাতীয় কাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
সম্মেলনে সীমান্ত হত্যা, পুশ-ইন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম, কারাগারে মৃত্যু, নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা, সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার, শ্রম অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং নাগরিক পরিসর সংকুচিত হওয়ার মতো সমসাময়িক মানবাধিকার ইস্যু নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বক্তারা মানবাধিকার শিক্ষা, গবেষণা, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে অধিকতর জবাবদিহিমূলক ও মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
সমাপনী অধিবেশনে দ্বিতীয় জাতীয় মানবাধিকার অলিম্পিয়াড–২০২৬-এর বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করা হয়। অনুষ্ঠানের সমাপনী বক্তব্যে এইচআরএসএস-এর চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার শাহজাদা আল আমিন কবির সকল অতিথি, বক্তা ও অংশগ্রহণকারীদের ধন্যবাদ জানান।

পড়ুনঃ  সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা নাহওয়া পর্যন্ত আমরা থামবো না-----ডাঃ শফিকুর রহমান

প্রেস বিজ্ঞপ্তি

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here