Home সম্পাদকীয় স্রেব্রেনিৎসা: সাদা কবরের শহরে দাঁড়িয়ে মানবতার পরাজয়ের সাক্ষী

স্রেব্রেনিৎসা: সাদা কবরের শহরে দাঁড়িয়ে মানবতার পরাজয়ের সাক্ষী

37
0

আগামীকাল ১১ জুলাই স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যা দিবস

স্রেব্রেনিৎসায় দাঁড়িয়ে প্রথম যে অনুভূতিটি আমাকে আচ্ছন্ন করেছিল, তা হলো—কিছু শহর শুধু মানচিত্রে থাকে না, ইতিহাসের বিবেকেও বেঁচে থাকে। যতদূর চোখ যায়, সারি সারি সাদা কবর, প্রতিটি কবরের নিচে একটি অসমাপ্ত জীবন, একটি বিধ্বস্ত পরিবার, একটি নিঃশেষ হয়ে যাওয়া স্বপ্ন। ইউরোপের হৃদয়ে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল, সভ্যতার সব অর্জন যেন এখানে এসে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। ১৯৯৫ সালের ১১ জুলাই বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার স্রেব্রেনিৎসায় সংঘটিত গণহত্যা শুধু একটি জাতির ট্র্যাজেডি নয়; এটি মানবতার ইতিহাসে এক অমোচনীয় কলঙ্ক। সেই স্মৃতিবিজড়িত জনপদে দাঁড়িয়ে দেখা, শোনা ও অনুভব করার অভিজ্ঞতার মাধ‍্যমে আমার “সেতুর ওপারে অশ্রু” নামক বই উপজীব্য।

কীভাবে ঘটেছিল এই গণহত্যা
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে ভয়াবহ গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃত স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যায় প্রায় আট হাজারের বেশি বসনিয়াক (বসনিয়ার মুসলিম) পুরুষ ও কিশোরকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়; স্মৃতিসৌধের ফলকে এই সংখ্যা লেখা আছে ৮ হাজার ৩৭২ জন। ১৯৯৩ সালে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ৮১৯ নম্বর প্রস্তাবের মাধ্যমে স্রেব্রেনিৎসাকে “নিরাপদ অঞ্চল” ঘোষণা করেছিল এবং সেখানে প্রায় সাড়ে তিনশ ডাচ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মোতায়েন করা হয়েছিল। কিন্তু ১৯৯৫ সালের জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে জেনারেল রাতকো ম্লাদিচের নেতৃত্বে সার্ব বাহিনী শহরটি ঘিরে ফেলে এবং হালকা অস্ত্রে সজ্জিত এই শান্তিরক্ষী বাহিনী আক্রমণ ঠেকাতে ব্যর্থ হয়। ১১ জুলাই শহরের পতনের পর নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের—প্রায় ত্রিশ হাজার মানুষকে—জোরপূর্বক স্থানান্তর করা হয়, আর হাজার হাজার মুসলিম পুরুষ ও কিশোরকে বন্দি কিংবা পাহাড়ি পথে পালিয়ে যেতে বাধ্য করা হয়।
পরবর্তীকালে জাতিসংঘের প্রাক্তন যুগোস্লাভিয়া আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (ICTY) এবং আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালত (ICJ) উভয়ই ২০০৪ ও ২০০৭ সালে এই ঘটনাকে আইনগতভাবে গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়—যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের মাটিতে আন্তর্জাতিক আদালতে স্বীকৃত প্রথম গণহত্যা। এই মামলায় মোট বিশজনেরও বেশি ব্যক্তিকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়, যাদের মধ্যে ছিলেন সার্ব সামরিক বাহিনীর প্রধান রাতকো ম্লাদিচ (যাবজ্জীবন কারাদণ্ড) এবং রিপাবলিকা স্রপস্কার সাবেক প্রেসিডেন্ট রাদোভান কারাজিচ (৪০ বছরের কারাদণ্ড, পরে যাবজ্জীবনে রূপান্তরিত)। আন্তর্জাতিক নিখোঁজ ব্যক্তি কমিশনের (ICMP) ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে এ পর্যন্ত সাত হাজারেরও বেশি ভুক্তভোগীকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে, যদিও এখনো প্রায় এক হাজার মানুষের কোনো সন্ধান মেলেনি।

পড়ুনঃ  কিভাবে একটি অপ্রত্যাশিত প্রত্যাবর্তন ঘটতে পারে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার ?

সারায়েভো থেকে স্রেব্রেনিৎসার পথে
সম্প্রতি বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা সফরের সুযোগ হয়। রাজধানী সারায়েভো পৌঁছানোর পর পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী আমাদের অভ্যর্থনা জানান বসনিয়ান বন্ধু দাখা হাসান, তালহা এবং মির্জা। পুরো সফরে মির্জাই ছিলেন আমাদের গাইড, চালক ও সমন্বয়কারী। বসনিয়া যুদ্ধের একজন যোদ্ধাহত সৈনিক হওয়ায় তাঁর প্রতিটি কথায় ছিল ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষ্য।
সফরের তৃতীয় দিনের গন্তব্য ছিল স্রেব্রেনিৎসা। সারায়েভো থেকে প্রায় ১২০ কিলোমিটারের পথ। দূরত্ব খুব বেশি নয়, কিন্তু পাহাড়ি আঁকাবাঁকা সড়কের কারণে পৌঁছাতে লেগে যায় প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা। যাত্রাপথে প্রকৃতি যেন নিজেকে উজাড় করে দিয়েছে—সবুজ পাহাড়, গভীর বন, ছোট ছোট নদী, গরু-ভেড়া-ছাগলের খামার, সব মিলিয়ে অপার সৌন্দর্য। কিন্তু সেই সৌন্দর্যের মাঝেই চোখে পড়ে সার্ব পতাকা, রাস্তার ধারে অসংখ্য কবর এবং যুদ্ধের স্মৃতি বহনকারী নীরব জনপদ।
মির্জা পথ দেখাতে দেখাতে বলছিলেন, কোন এলাকা একসময় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল, কোথায় যুদ্ধের পর মুসলমানদের অস্তিত্ব প্রায় মুছে গেছে, কোথাও বা হাতে গোনা কয়েকটি পরিবার টিকে আছে। দূরে কোনো মসজিদের মিনার দেখিয়ে তিনি বলছিলেন, এই গ্রামগুলো একসময় মুসলমানদের কোলাহলে মুখর ছিল।
একসময় আমরা পৌঁছাই ব্রাতুনাচ অঞ্চলে। সেখান থেকে শুরু হয় পোটোচারির পথ। মির্জা আমাদের জানালেন, এই অঞ্চল এখন সার্ব অধ্যুষিত, অথচ যুদ্ধের আগে এখানকার জনসংখ্যার বড় অংশই ছিল বসনিয়াক মুসলমান।

পোটোচারি: স্মৃতির প্রাঙ্গণে
পোটোচারি পৌঁছে আমরা প্রথমে যাই শহীদদের কবরস্থানে। যতদূর চোখ যায়, সারি সারি সাদা সমাধিফলক। প্রতিটি কবরের ওপর খোদাই করা একটি নাম, জন্মসাল ও মৃত্যুর তারিখ। প্রতিটি কবরের সাদা পাথরের ফলকের উপর আরবি ভাষায় লেখা “আল-ফাতিহা”। কিছু কবরের পাশে নতুন সবুজ চিহ্ন দেখে জানতে পারলাম, ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে সম্প্রতি শনাক্ত হওয়া শহীদদেরও এখানে দাফন করা হয়েছে। তিন দশক পেরিয়ে গেলেও এই গণহত্যার ইতিহাস এখনো শেষ হয়নি; প্রতি বছর নতুন করে চিহ্নিত হওয়া দেহাবশেষ এই কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।
কবরগুলোর দিকে তাকিয়ে যে বিষয়টি আমাকে সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়েছে, তা হলো নিহতদের বয়স। অধিকাংশই তরুণ—১৬ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে। বোঝা যায়, এটি ছিল শুধু হত্যা নয়; একটি জাতিকে ভবিষ্যৎহীন করে দেওয়ার পরিকল্পিত প্রয়াস।
কবরস্থানের পাশেই রয়েছে বিশাল উন্মুক্ত নামাজের প্রাঙ্গণ। প্রতি বছরের ১১ জুলাই এখানে বিশ্বের নানা দেশ থেকে মানুষ আসেন। নতুন শনাক্ত শহীদদের দাফন করা হয়, কোরআন তিলাওয়াত হয়, দোয়া হয়, মানবতার পক্ষে অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়।
এর পাশেই দাঁড়িয়ে আছে সেই কুখ্যাত ব্যাটারি ফ্যাক্টরি। হাজার হাজার নিরস্ত্র মুসলমানের শেষ আশ্রয়স্থল ছিল এটি। অথচ এর ধারণক্ষমতা ছিল মাত্র কয়েক হাজার মানুষের। ভবনটির কাছেই ছিল জাতিসংঘের ডাচ শান্তিরক্ষীদের ঘাঁটি। কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উপস্থিতিও সেদিন নিরস্ত্র মানুষদের রক্ষা করতে পারেনি। ইতিহাসের অন্যতম বড় ব্যর্থতার প্রতীক হয়ে আছে এই স্থান। উল্লেখ্য, নেদারল্যান্ডসের সরকার নিজেই ২০০২ সালে এই গণহত্যা ঠেকাতে ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে পদত্যাগ করেছিল, আর পরবর্তী সময়ে ডাচ আদালত রাষ্ট্রকেও শত শত মৃত্যুর জন্য দায়ী করে রায় দেয়।

পড়ুনঃ  সাউথ আমেরিকার দিনগুলো

মৃত্যুর মিছিল
১৯৯৫ সালের জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে সার্ব বাহিনী স্রেব্রেনিৎসা ঘিরে ফেলে। ১১ জুলাই শহরটির পতনের পর নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের আলাদা করা হয়, আর হাজার হাজার মুসলিম পুরুষ ও কিশোরকে বন্দি কিংবা পাহাড়ি পথে পালিয়ে যেতে বাধ্য করা হয়। যারা তুজলার উদ্দেশে বন-পাহাড় পেরিয়ে যাত্রা করেছিলেন, তাঁদের সেই পথ আজও “মৃত্যুর মিছিল” নামে পরিচিত। পথে অতর্কিত হামলা, গোলাবর্ষণ ও গণহত্যায় অধিকাংশই প্রাণ হারান। দিনের পর দিন পাহাড়ি জঙ্গলে পড়ে ছিল অসংখ্য লাশ। অপরাধ আড়াল করতে সার্ব বাহিনী পরবর্তীতে ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে গণকবর খুঁড়ে দেহাবশেষ বহু দূরের দ্বিতীয় ও তৃতীয় গণকবরে স্থানান্তর করে, যাতে তদন্তকারীরা সহজে খুঁজে না পান। পরে গণকবর থেকে উদ্ধার হওয়া দেহাবশেষের ডিএনএ পরীক্ষা করে তাঁদের পরিচয় শনাক্ত করা হয়। এখনো নতুন নতুন পরিচয় মিলছে।
স্মৃতি জাদুঘরে সংরক্ষিত আলোকচিত্র, ভিডিও, পোশাক, ব্যক্তিগত সামগ্রী এবং গণকবর থেকে উদ্ধার হওয়া নানা নিদর্শন দেখে মনে হচ্ছিল, এগুলো কেবল ইতিহাসের উপকরণ নয়; এগুলো মানুষের অসমাপ্ত জীবনের সাক্ষ্য।

অস্বীকারের ছায়া
পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী স্থানীয় বসনিয়ান টেলিভিশন চ্যানেল ২১ এর সাংবাদিক বাহিদার সঙ্গে আমাদের সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠিত হয়। পরে আমরা স্রেব্রেনিৎসা শহরের একটি মাদ্রাসা পরিদর্শন করি। স্থানীয় কয়েকজন সার্ব বাসিন্দার সঙ্গেও কথা হয়। বিস্ময়ের বিষয়, তিন দশক পরও অনেকে এই গণহত্যাকে স্বীকার করতে অনীহা প্রকাশ করেন। এই অস্বীকৃতির প্রবণতা রিপাবলিকা স্রপস্কায় এখনো রাজনৈতিক মূলধারার অংশ হয়ে আছে—২০২১ সালে সেখানকার নেতারা একটি বিতর্কিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিলেন, যেখানে গণহত্যাকে নিছক সামরিক সংঘাত হিসেবে দেখানোর চেষ্টা হয়েছিল, যদিও আন্তর্জাতিক আদালতে প্রতিষ্ঠিত সত্য তার বিপরীত। এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় বসনিয়ার আন্তর্জাতিকভাবে নিযুক্ত হাই রিপ্রেজেন্টেটিভের কার্যালয় গণহত্যা অস্বীকার করাকে দণ্ডনীয় অপরাধ ঘোষণা করে আইন প্রণয়ন করে। ইতিহাসের এই অস্বীকার প্রমাণ করে, যুদ্ধ শেষ হলেও তার মানসিক ক্ষত বহুদিন বেঁচে থাকে।
স্রেব্রেনিৎসা আমাকে নতুন করে উপলব্ধি করিয়েছে—গণহত্যা কেবল মানুষকে হত্যা করে না; এটি একটি সমাজের জনসংখ্যা, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, পরিবার এবং ভবিষ্যৎকে ধ্বংস করে দেয়। যে জনপদ একসময় মুসলমানদের প্রাণচাঞ্চল্যে মুখর ছিল, সেখানে আজও সেই শূন্যতার প্রতিধ্বনি শোনা যায়।
ফেরার পথে পাহাড়গুলোকে আর আগের মতো সুন্দর লাগছিল না। মনে হচ্ছিল, প্রতিটি বন, প্রতিটি উপত্যকা, প্রতিটি নীরব পথ অগণিত শহীদের শেষ পদচিহ্ন ধারণ করে আছে। সাদা কবরের সারি যেন নীরবে মানবজাতিকে প্রশ্ন করছে—আমরা কি ইতিহাস থেকে সত্যিই শিক্ষা নিয়েছি?
১১ জুলাই তাই শুধু বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার শোকের দিন নয়; এটি সমগ্র মানবজাতির আত্মসমালোচনার দিন। স্রেব্রেনিৎসা আমাদের শেখায়, ঘৃণা, উগ্র জাতীয়তাবাদ এবং আন্তর্জাতিক নীরবতা একত্রিত হলে সভ্যতা কতটা ভয়াবহ পরিণতির দিকে যেতে পারে। তাই স্রেব্রেনিৎসাকে স্মরণ করা মানে কেবল অতীতকে স্মরণ করা নয়; ভবিষ্যতে যেন পৃথিবীর কোথাও আর কোনো স্রেব্রেনিৎসা সৃষ্টি না হয়, সেই অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা।

  • সুমন মাহমুদ
    লেখক ও টিভি উপস্থাপক
    লন্ডন
পড়ুনঃ  বিশ্বাস, ত্যাগ ও রাষ্ট্রনায়কোচিত এক জীবনের মহাকাব্য

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here