Home Uncategorised মাওলানা মওদুদীর প্রাসঙ্গিকতা ও বারবার বিতর্কের পুনরাবৃত্তি

মাওলানা মওদুদীর প্রাসঙ্গিকতা ও বারবার বিতর্কের পুনরাবৃত্তি

75
0

বিংশ শতাব্দীর শুরুটা মুসলিম বিশ্বের ইতিহাসে ছিল গভীর সংকট, বিপর্যয়, পূনরুত্থান এবং পুনর্বিন্যাসের এক যুগ। প্রাথমিত তিন দশক একদিকে ব্রিটিশসহ ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তির আরব ও এশিয়ায় প্রভাব বিস্তার, অন্যদিকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অভিঘাত, অটোমান সাম্রাজ্যের পতন এবং খিলাফতের অবসান—সব মিলিয়ে মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক নেতৃত্ব, বুদ্ধিবৃত্তিক আত্মবিশ্বাস এবং সভ্যতাগত দিকনির্দেশনায় এক গভীর শূন্যতা তৈরি হয়েছিল।
যদিও এই শূন্যতা কোনো একদিনে তৈরি হয়নি। এর পেছনে ছিল কয়েক দশকের একের পর এক রাজনৈতিক পরাজয়, ঔপনিবেশিক আধিপত্য, জ্ঞানচর্চার স্থবিরতা এবং মুসলিম সমাজের আত্মপরিচয়-সংকট। সেই দীর্ঘ সন্ধিক্ষণে মুসলিম বিশ্বে একদল অসাধারণ চিন্তাবিদের আবির্ভাব ঘটে যাদের মধ্যে জামালুদ্দিন আফগানি, মুহাম্মদ আবদুহ, রশিদ রিদা, আল্লামা ইকবাল, মুহাম্মদ আসাদ, মালেক বেন্নাবি, হাসান আল-বান্না, সাইয়েদ কুতুব, মুহাম্মদ হামিদুল্লাহ, মার্টিন লিংস এবং তাঁদের সমসাময়িক আরও অনেকে। ভারতীয় উপমহাদেশে মাওলানা আবুল আ’লা মওদুদীও এই বৃহত্তর বুদ্ধিবৃত্তিক পুনর্জাগরণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ।
মওদুদীকে বোঝার জন্য তাঁকে শুধু একটি দল, একটি মতবাদ (মওদুদীবাদ) কিংবা একটি উপমহাদেশীয় রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে আটকে দেখলে চলবে না। তাঁকে দেখতে হবে তাঁর সময়ের গভীর সংকটের ভেতর থেকে উঠে আসা একজন চিন্তাবিদ ও সংস্কারক হিসেবে।
তিনি এমন এক সময়ে কিছু প্রশ্ন তুলেছিলেন, যখন মুসলিম সমাজের সামনে মৌলিক প্রশ্ন ছিল—ইসলাম কি কেবল ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠানের বিষয়, নাকি এটি ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র, অর্থনীতি, নৈতিকতা এবং সভ্যতা সম্পর্কে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনদর্শনও প্রদান করে? মওদুদীর উত্তর ছিল তাঁর নিজস্ব। তাঁর সঙ্গে একমত হওয়া জরুরি নয়; কিন্তু তাঁর প্রশ্নগুলোকে অগ্রাহ্য করার সুযোগও নেই। এখানেই মওদুদীর প্রাসঙ্গিকতার মূল জায়গাটি।
ভারতীয় উপমহাদেশে জামায়াতে ইসলামী যতদিন একটি সক্রিয় রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বাস্তবতা হিসেবে টিকে থাকবে, ততদিন মওদুদীকে নিয়ে আলোচনা থাকবে। তাঁর পক্ষে কথা হবে, বিপক্ষে কথা হবে, তাঁর চিন্তার পুনর্মূল্যায়ন হবে, সমালোচনা হবে, এমনকি কঠোর বিরোধিতাও হবে। এই প্রক্রিয়া স্বাভাবিক। বরং যে চিন্তাবিদ সমাজের প্রচলিত চিন্তার কাঠামোকে গভীরভাবে নাড়া দেন, তাঁকে ঘিরে দীর্ঘস্থায়ী বিতর্ক থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশ্ন হলো—আমাদের কি প্রতিটি অভিযোগের জবাব দিতে হবে?
কেউ মওদুদীর বিরুদ্ধে একটি বই লিখলেন, অমনি তার জবাবে আরেকটি বই লিখতে হবে; কেউ তাঁর আকিদা নিয়ে প্রশ্ন তুললেন, সঙ্গে সঙ্গে তার উত্তর দিতে হবে; কেউ তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের সমালোচনা করলেন, আবার আমাদের নতুন করে প্রতিরক্ষা নির্মাণ করতে হবে—এই অনন্ত প্রতিক্রিয়াশীলতার মধ্যে আমরা আসলে কোথায় যাচ্ছি? একজন চিন্তাবিদের প্রাসঙ্গিকতা কি তাঁর বিরুদ্ধে লেখা বইয়ের সংখ্যা দিয়ে নির্ধারিত হয়?
কখনোই নয়।
বরং অনেক সময় অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়াই একটি চিন্তাবিদকে আরও বেশি আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে। আপনি যাঁকে অপ্রাসঙ্গিক প্রমাণ করতে ব্যস্ত, আপনার অবিরাম ব্যস্ততাই কখনো কখনো তাঁর প্রাসঙ্গিকতার নতুন প্রমাণ হয়ে দাঁড়ায়। মওদুদীর ক্ষেত্রেও বিষয়টি অনেকটা এমন।
তাঁর আকিদা, তাঁর রাজনৈতিক দর্শন, তাঁর রাষ্ট্রচিন্তা, তাঁর ইসলামী ব্যাখ্যা—এসব নিয়ে সমালোচনা অবশ্যই হতে পারে। হওয়াও উচিত। কিন্তু সমালোচনা আর খণ্ডন-উন্মাদনা এক জিনিস নয়। গবেষণা আর প্রচারপত্র এক জিনিস নয়। প্রমাণভিত্তিক বুদ্ধিবৃত্তিক সমালোচনা আর বাজারি পুস্তিকা এক জিনিস নয়। মওদুদীর বিরুদ্ধে লেখা সব বইকে এক পাল্লায় মাপারও কোনো যুক্তি নেই। কোনো কোনো সমালোচনা ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কোনোটি আকিদাগতভাবে আলোচনাযোগ্য, কোনোটি রাজনৈতিকভাবে প্রাসঙ্গিক; আবার কোনো কোনো লেখা নিছক দলীয় polemic—যেখানে গবেষণার চেয়ে পূর্বনির্ধারিত সিদ্ধান্তই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
মাওলানা বাবু নগরীর পক্ষ হতে উত্থিত মাওলানা মওদুদীর আকিদা নিয়ে প্রশ্ন করার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো: তিনি কী প্রমাণ দিয়েছেন? তাঁর বক্তব্যের উৎস কী? তাঁর উদ্ধৃতি পূর্ণাঙ্গ কি না? তিনি মওদুদীর বক্তব্যকে তার সামগ্রিক চিন্তার ভেতরে বিচার করেছেন, নাকি বিচ্ছিন্ন বাক্য তুলে একটি সিদ্ধান্ত দাঁড় করিয়েছেন? এটাই হওয়া উচিত আমাদের মানদণ্ড।
বাবু নগরীর ব্যক্তিগত যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলারও কোনো প্রয়োজন নেই। একজন আলেম বা লেখককে সম্মান রেখেই তাঁর গ্রন্থের মান নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। একইভাবে কোনো বই প্রকাশিত হয়েছে বলেই সেটি গবেষণামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে যায় না। ছাপা অক্ষর কোনো বক্তব্যকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সত্যে পরিণত করে না।
আমাদের আরও একটি বিষয় মনে রাখা দরকার। মওদুদী ১৯৪০-এর দশকে যে রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রদর্শনের ভাষায় মুসলিম সমাজকে দেখেছেন, প্রায় এক শতাব্দী পরে এসে সেই ভাষাকে অক্ষরে অক্ষরে বর্তমান বাস্তবতার ওপর বসিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। পৃথিবী বদলেছে। রাষ্ট্রের ধারণা বদলেছে। আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা বদলেছে। নাগরিকত্বের ধারণা বদলেছে। নারী ও পুরুষের সামাজিক ভূমিকা নিয়ে বৈশ্বিক আলোচনা বদলেছে। মানবাধিকার, সংখ্যালঘু অধিকার, গণতন্ত্র, সাংবিধানিকতা, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, প্রযুক্তি, অর্থনীতি—সবকিছুর বাস্তবতা বদলে গেছে।
তাঁর চিন্তার যেটি আজও শক্তিশালী, সেটি গ্রহণ করতে হবে। যেটি ঐতিহাসিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত, সেটিকে ঐতিহাসিক হিসেবে বুঝতে হবে। যেটি আজ পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে, সেটিকে পুনর্বিবেচনা করতে হবে। আর যেটি আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়, সেটির যুক্তিনিষ্ঠ সমালোচনা করতে হবে। কোনো চিন্তাবিদকে শ্রদ্ধা করার অর্থ তাঁর প্রতিটি বক্তব্যকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে মেনে নেওয়া নয়। আবার কোনো বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত করার অর্থ সেই চিন্তাবিদকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে নির্বাসিত করে দেওয়াও নয়।
মওদুদী কোনো নবী নন, কোনো ওহিপ্রাপ্ত ব্যক্তিও নন। তিনি একজন মানুষ, একজন আলেম, একজন লেখক এবং একজন রাজনৈতিক চিন্তাবিদ। তাঁর চিন্তার মধ্যে যেমন শক্তি আছে, তেমনি সীমাবদ্ধতাও থাকা স্বাভাবিক। তাঁর সময়ের প্রশ্ন ছিল তাঁর সময়ের প্রশ্ন; আমাদের সময়ের প্রশ্ন আমাদেরই তৈরি করতে হবে।
এ কারণেই মওদুদীকে নিয়ে আমাদের কাজ শুধু তাঁকে রক্ষা করা নয়; তাঁকে পড়া, বিশ্লেষণ করা, প্রশ্ন করা এবং প্রয়োজনে অতিক্রম করাও।
যেমন আলিজা ইজেতবেগোভিচকে তাঁর নিজস্ব ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার ভেতর থেকে বুঝতে হয়, তেমনি হাসান আল-বান্না, সাইয়েদ কুতুব, মালেক বেন্নাবি কিংবা অন্য যেকোনো আধুনিক মুসলিম চিন্তাবিদকে বুঝতে হলে তাঁদের সময়, সমাজ, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশকে সামনে রাখতে হয়। তাঁদের নিয়ে তাঁদের নিজ নিজ সমাজে যে প্রশংসা বা সমালোচনা রয়েছে, সেটিও একটি বাস্তবতা; কিন্তু কোনো চিন্তাবিদের আন্তর্জাতিক গুরুত্ব কেবল তাঁর নিজ দেশের জনপ্রিয়তা বা বিরোধিতার ওপর নির্ভর করে না। মওদুদীর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।
তাঁকে নিয়ে বাংলাদেশের কোনো একটি ঘরানায় যত তীব্র ভাষায় সমালোচনা করা হলো, সেটিই তাঁর বৈশ্বিক বুদ্ধিবৃত্তিক মূল্যায়নের চূড়ান্ত মানদণ্ড নয়। আবার আরব বিশ্ব, পশ্চিমা বিশ্ব কিংবা অন্য প্রান্তে তাঁর লেখা নিয়ে গবেষনা হয় বলেই তাঁর প্রতিটি বক্তব্য সত্য হয়ে যায় না।
আমার আপত্তি মওদুদীর সমালোচনার বিরুদ্ধে নয়। বরং আমার আপত্তি হলো—আমরা যেন মওদুদীকে নিয়ে আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তির একটি অস্বাভাবিক পরিমাণ ব্যয় না করি কেবল প্রতিটি অভিযোগের তাৎক্ষণিক জবাব দিতে গিয়ে। কারণ আমাদের সামনে আজ আরও বড় প্রশ্ন আছে। ইসলামী রাজনৈতিক চিন্তা আজ কেমন হবে? রাষ্ট্র ও ধর্মের সম্পর্ক কীভাবে নতুন করে ভাবা যায়? গণতন্ত্র, শূরা ও নাগরিক অংশগ্রহণের মধ্যে সম্পর্ক কী? অমুসলিম নাগরিকের অধিকার কী? নারীর রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকারকে ইসলামী চিন্তার ভেতর কীভাবে নতুন করে ব্যাখ্যা করা যায়? আধুনিক অর্থনীতি, প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, পরিবেশ, যুদ্ধ, অভিবাসন, জাতীয়তাবাদ, বৈশ্বিক ন্যায়বিচার—এসব প্রশ্নের সামনে ইসলামী চিন্তার উত্তর কী? আজকের তরুণ মুসলমানের আত্মপরিচয়, বিশ্বাস, নৈতিকতা ও বিশ্বদৃষ্টিকে আমরা কীভাবে নির্মাণ করব?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে বের করার জন্য আমাদের যে মেধা, সময়, গবেষণা, সৃজনশীলতা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সাহস দরকার—তা কি আমরা শুধু মওদুদীর বিরুদ্ধে লেখা প্রতিটি পুস্তিকার জবাব দিতে গিয়ে ব্যয় করব? আমার উত্তর—না।
মওদুদীকে খণ্ডন করার চেয়ে অনেক বড় কাজ হলো মওদুদীর পরের যুগের জন্য নতুন চিন্তা নির্মাণ করা। মওদুদীর সঙ্গে বিতর্ক করার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—আমাদের সময়ের জন্য এমন চিন্তা তৈরি করা, যা আগামী একশো বছর পরেও মুসলিম সমাজের সামনে নতুন প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার ক্ষমতা রাখবে।

পড়ুনঃ  Experiencing the new Oculus Rift VR headset

সুমন মাহমুদ

কলামিস্ট, টিভি উপস্থাপক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here