Home কমিউনিটি ওয়াই ডাউনসে একদিন

ওয়াই ডাউনসে একদিন

63
0

মো. আব্দুল মুনিম জাহেদী ক্যারল

ব্রিটিশ সামার টাইমের এক শনিবার। সাপ্তাহিক ছুটির দিন। প্রতিদিনের ব্যস্ততা, কাজের চাপ আর শহুরে জীবনের কোলাহল থেকে কিছুটা দূরে গিয়ে প্রকৃতির সান্নিধ্যে একটি দিন কাটানোর ইচ্ছা থেকেই আমাদের পাঁচ বন্ধুর এই ছোট্ট ভ্রমণের আয়োজন।

আমাদের গন্তব্য ছিল কেন্টের অপূর্ব সুন্দর ওয়াই ডাউনস (Wye Downs)। ভ্রমণসঙ্গী ছিলেন আব্দুল মালিক, শাহার আলী ইমরান, কয়েছুর রহমান, সিরাজুল ইসলাম এবং আমি, মো. আব্দুল মুনিম জাহেদী ক্যারল।

সকালের মনোরম আবহাওয়ায় আমরা যখন ওয়াই ডাউনসের উদ্দেশে রওনা হলাম, তখন থেকেই মনে হচ্ছিল—আজকের দিনটি অন্যরকম হতে যাচ্ছে। শহরের ব্যস্ত রাস্তা পেরিয়ে ধীরে ধীরে যখন সবুজে ঘেরা কেন্টের গ্রামাঞ্চলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম, চোখের সামনে বদলে যেতে লাগল দৃশ্যপট। কংক্রিটের শহরের জায়গা নিল সবুজ মাঠ, খোলা আকাশ আর শান্ত প্রকৃতি।

ওয়াই ডাউনসে পৌঁছানোর পর মনে হলো, প্রকৃতি যেন নিজের হাতে সাজিয়ে রেখেছে এই জায়গাটিকে। চারদিকে সবুজের সমারোহ, দূরে ঢেউ খেলানো পাহাড়ি ভূমি আর নির্মল বাতাস। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে চারপাশের সৌন্দর্য উপভোগ করতেই মনটা প্রশান্তিতে ভরে গেল।

জঙ্গলের মাঝে প্রচুর রাজবেরি চোখে পড়ল। অন্যদের মতো আমরাও অনেক পাকা রাজবেরি তুলে খেয়ে আনন্দ করেছি। প্রকৃতির মাঝে হাঁটতে হাঁটতে নিজের হাতে ফল তুলে খাওয়ার আনন্দই ছিল আলাদা।

ডেভিলস নীডিং ট্রাফ

আমাদের প্রধান আকর্ষণ ছিল ডেভিলস নীডিং ট্রাফ (Devil’s Kneading Trough)। চক পাথরের প্রাকৃতিক ভূ-গঠনে তৈরি এই অসাধারণ উপত্যকা ওয়াই ডাউনসের অন্যতম দর্শনীয় স্থান। উঁচুতে উঠে নিচের দিকে তাকালে মনে হয়, প্রকৃতি যেন হাজার বছর ধরে অত্যন্ত যত্নে এই উপত্যকার ছবি এঁকেছে।

উঁচু জায়গা থেকে চোখ যতদূর যায়, দেখা যায় কেন্টের বিস্তীর্ণ গ্রামাঞ্চল। সবুজ মাঠ, ছোট ছোট রাস্তা, দূরের বসতবাড়ি—সব মিলিয়ে এক অপূর্ব দৃশ্য। পরিষ্কার আকাশের নিচে সেই দৃশ্য দেখে মনে হচ্ছিল, আমরা যেন কোনো ছবির ভেতরে দাঁড়িয়ে আছি।

পড়ুনঃ  শেখ মুজিবুর রহমানের উপরে নির্মিত ১০টি নতুন বাংলা গানের অ্যালবাম প্রকাশনা ও বিশেষ সঙ্গীতানুষ্ঠাণ

বসন্ত ও গ্রীষ্মে ওয়াই ডাউনসের সৌন্দর্য আরও বেড়ে যায়। চকভূমির ঘাসের মাঝে ফুটে থাকা নানা রঙের বুনো ফুল, উড়ে বেড়ানো প্রজাপতি আর পাখির ডাক প্রকৃতির সঙ্গে আমাদের সম্পর্ককে আরও গভীর করে তোলে। কোথাও কোনো ব্যস্ততা নেই, নেই শহরের হর্ন কিংবা কোলাহল—শুধু নির্মল বাতাস আর প্রকৃতির নিজস্ব সুর।

বন্ধুত্ব, আড্ডা ও আনন্দ

পাঁচ বন্ধুর এই সফরে প্রকৃতির সৌন্দর্যের পাশাপাশি ছিল হাসি-আনন্দ, গল্প আর আড্ডা। কখনো সামনে এগিয়ে চলা, কখনো কোনো সুন্দর জায়গায় দাঁড়িয়ে ছবি তোলা, আবার কখনো সবাই মিলে গল্পে মেতে ওঠা—সময়টা কখন যে দ্রুত চলে যাচ্ছিল, টেরই পাচ্ছিলাম না।

তবে দিনের সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনাগুলোর একটি ছিল আসরের নামাজের সময়। একটি সুন্দর জায়গায় আমরা জামাতে নামাজ আদায় করছিলাম। নামাজের মাঝামাঝি সময়ে হঠাৎ লক্ষ্য করলাম, দুজন মানুষ আমাদের কাছাকাছি একটি গাড়িতে বসে অপেক্ষা করছেন। নামাজ শেষে তাঁরা আমাদের সালাম দিয়ে জানালেন, আমাদের নিরাপত্তার জন্যই তাঁরা সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

বিষয়টি শুনে আমরা বিস্মিত ও কৃতজ্ঞ হলাম। তাঁদের সঙ্গে আলাপ করে জানতে পারলাম, পার্কের ভেতরে নামাজ আদায় করার সময় মাঝেমধ্যে কিছু মানুষ আক্রমণের শিকার হয়েছেন। তাই আমাদের নিরাপত্তার কথা ভেবে তাঁরা পাশে ছিলেন। তাঁদের এই মানবিক ও আন্তরিক আচরণে আমরা সত্যিই মুগ্ধ হয়েছি। তাঁরা নেপাল থেকে এসেছেন—এই পরিচয় জানার পর তাঁদের প্রতি আমাদের ভালো লাগা আরও বেড়ে গেল।

প্রকৃতির পথে হাঁটা

ওয়াই ডাউনসের হাঁটার পথগুলোও বেশ আকর্ষণীয়। কোথাও সহজ পথ, কোথাও একটু উঁচু-নিচু পথ; কোথাও খোলা ডাউনল্যান্ড, আবার কোথাও বনভূমির ছায়াময় পথ। হাঁটতে হাঁটতে প্রতিটি বাঁকের পর যেন নতুন কোনো দৃশ্য আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল।

একসময় মনে হলো, এই ছোট্ট ভ্রমণটি আসলে শুধু একটি জায়গা দেখতে আসা নয়; এটি ছিল বন্ধুত্বকে আরও কাছ থেকে অনুভব করার একটি সুযোগ। ব্যস্ত জীবনের নানা দায়িত্বের মাঝে পাঁচ বন্ধু একসঙ্গে কয়েক ঘণ্টা হাসি, গল্প আর প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে পেরেছি—এটাই ছিল দিনের সবচেয়ে বড় পাওয়া।

পড়ুনঃ  পূর্ব লন্ডনের বিশৃঙ্খলার ঘটনায় ব্রিটিশ বাংলাদেশি কমিউনিটির নিন্দা, শান্তি ও আইনের শাসনের পক্ষে ঐক্যের আহ্বান

সূর্য যখন ধীরে ধীরে পশ্চিম আকাশে হেলে পড়ছিল, তখন ফেরার সময় হলো। শরীর কিছুটা ক্লান্ত, কিন্তু মন ভীষণ ভালো। মনে হচ্ছিল, ওয়াই ডাউনস আমাদের কিছু সুন্দর স্মৃতি দিয়ে বিদায় জানাচ্ছে।

লন্ডনের ব্যস্ত জীবন থেকে মাত্র এক দিনের জন্য বেরিয়ে কেন্টের এই সবুজ প্রকৃতির মাঝে কাটানো সময় আমাদের মনে অনেকদিন থেকে যাবে। হয়তো আবার কোনো এক শনিবার আমরা পাঁচ বন্ধু বেরিয়ে পড়ব—অন্য কোনো গন্তব্যের খোঁজে, নতুন কোনো গল্পের সন্ধানে।

ভ্রমণসঙ্গী: আব্দুল মালিক, শাহার আলী ইমরান, কয়েছুর রহমান, সিরাজুল ইসলাম ও মো. আব্দুল মুনিম জাহেদী ক্যারল।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here