নারবোন থেকে বেরিয়ে পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমের দিকে তাকালে আজ যে দক্ষিণ ফ্রান্সের যে বিস্তৃত অঞ্চল দেখা যায়, তার সঙ্গে অষ্টম শতকের ভূগোলের কোনো সহজ মিল খুঁজে পাওয়া কঠিন। আজ এখানে আঙুরের খেত, ছোট ছোট শহর, পাথরের গ্রাম, আধুনিক সড়ক, পর্যটনকেন্দ্র এবং ভূমধ্যসাগরের দিকে নেমে যাওয়া বিস্তৃত সমতলভূমি। কিন্তু তেরোশো বছর আগে এই ভূখণ্ড ছিল এক সীমান্তভূমি—একদিকে ফ্রাঙ্কিশ রাজ্য, অন্যদিকে পিরেনিজের ওপারে মুসলিম-শাসিত আল-আন্দালুস। সেই সময়ের এই অঞ্চলটির ঐতিহাসিক নাম ছিল সেপ্টিমেনিয়া।
সেপ্টিমেনিয়া নামটি আজকের ফরাসি প্রশাসনিক মানচিত্রে নেই। কোনো আধুনিক ফরাসি নাগরিককে যদি জিজ্ঞেস করা হয় সেপ্টিমেনিয়া কোথায়, অনেকেই হয়তো নামটিই শুনেছেন বলে মনে করতে পারবেন না। অথচ মধ্যযুগের প্রথম ভাগে এটি ছিল পশ্চিম ইউরোপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত অঞ্চল। বর্তমান আউদ, এরো, গারদ, লোজের এবং পিরেনে-ওরিয়ঁতাল—এই পাঁচ জেলার বড় অংশ নিয়ে গড়ে ওঠা এই ভূখণ্ডে ছিল নারবোন, বেজিয়ে, কারকাসোন, নিম, মাগ্লন এবং অন্যান্য পুরোনো নগর। কথিত আছে, লোদেভসহ এমনই সাতটি প্রধান শহরের (লাতিন “ঝবঢ়ঃবস” অর্থাৎ সাত) নামানুসারেই অঞ্চলটির নাম হয়েছিল সেপ্টিমেনিয়া—যদিও এই ব্যুৎপত্তি নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ আছে। এই শহরগুলোর কিছু ছিল রোমান ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী, কিছু ছিল ভিসিগথ যুগের রাজনৈতিক কেন্দ্র, আর অষ্টম শতকের প্রথম ভাগে এগুলোর ওপর দিয়ে বয়ে যায় আরেকটি নতুন শক্তির প্রভাব—মুসলিম আল-আন্দালুসের।
নারবোনে দাঁড়িয়ে এই বৃহত্তর ভূখণ্ডের কথা ভাবলে প্রথমেই যে বিষয়টি মনে আসে, তা হলো সীমান্ত। এর পশ্চিম-উত্তরে আধুনিক ফ্রান্সের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নগরী তুলুস বা তুলুজ। অন্যদিকে পূর্ব-উত্তরে ভূমধ্যসাগরের তীরবর্তী শহর মন্তেপেলিয়ার, যা সমুদ্র উপকূল ধরে ইউরোপের পূর্ব দিকে রোমান রাজত্বের দিকে গমনাগমনের অন্যতম ঐতিহাসিক পথ। কিন্তু সেপ্টিমেনিয়ার সীমান্ত আজকের রাষ্ট্রীয় সীমান্তের মতো ছিল না। এখানে কাঁটাতারের বেড়া ছিল না, সীমান্তরক্ষী ছিল না, পাসপোর্ট ছিল না। পাহাড়, নদী, দুর্গ, নগর ও আনুগত্যের পরিবর্তনই সীমান্ত নির্ধারণ করত। কোনো একটি শহর মুসলিম নিয়ন্ত্রণে থাকা মানেই তার আশপাশের প্রতিটি গ্রাম একইভাবে নিয়ন্ত্রিত ছিল—এমনও নয়। কোথাও সরাসরি সামরিক কর্তৃত্ব, কোথাও কর-নির্ভর সম্পর্ক, কোথাও স্থানীয় অভিজাতদের সঙ্গে সমঝোতা, কোথাও আবার বিদ্রোহ ও প্রতিরোধ—এই সবকিছু মিলিয়েই তৈরি হয়েছিল সেপ্টিমেনিয়ার রাজনৈতিক বাস্তবতা।
আজকের মানচিত্রে পিরেনিজ পর্বতমালা দেখে বোঝা যায়, কেন দক্ষিণ ফ্রান্সের এই অঞ্চল মুসলিম শাসকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। পিরেনিজ ছিল একটি প্রাকৃতিক বাধা, কিন্তু অতিক্রম-অযোগ্য প্রাচীর নয়। পূর্ব ও পশ্চিমের কয়েকটি গিরিপথ দিয়ে বহু শতাব্দী ধরে মানুষ ও পশু চলাচল করেছে। আইবেরীয় উপদ্বীপের সঙ্গে দক্ষিণ গলের যোগাযোগ রোমান যুগ থেকেই ছিল। মুসলিম বিজয়ের পর সেই পুরোনো যোগাযোগের পথই নতুন রাজনৈতিক অর্থ লাভ করে।
আল-আন্দালুসে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর কয়েক বছরের মধ্যেই মুসলিম বাহিনী পিরেনিজ অতিক্রম করে উত্তরের দিকে অগ্রসর হয়। ৭১৯-৭২০ সালের দিকে নারবোন দখল তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলোর একটি। আরবূনা হয়ে ওঠে উত্তরের সামরিক ও প্রশাসনিক কেন্দ্র। কিন্তু নারবোন দখলের অর্থ ছিল কেবল একটি শহর দখল নয়। এর মাধ্যমে মুসলিম শক্তি ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার এবং সেপ্টিমেনিয়ার অভ্যন্তরে অগ্রসর হওয়ার ভিত্তি অর্জন করেছিল।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার। তখন আধুনিক অর্থে ফ্রান্স রাষ্ট্রের অস্তিত্ব ছিল না। ছিল ফ্রাঙ্কিশ রাজ্য, ছিল বিভিন্ন স্থানীয় রাজনৈতিক শক্তি, ছিল ভিসিগথ ঐতিহ্য, ছিল গির্জার ক্ষমতা, ছিল স্থানীয় অভিজাতদের জমি ও কর্তৃত্ব। মুসলিম বাহিনী যখন এই অঞ্চলে আসে, তারা যে ভূখণ্ডে প্রবেশ করে তা ছিল বহুস্তরীয় রাজনৈতিক কাঠামোর অংশ।
এখানে রোমের উত্তরাধিকার এখনও জীবন্ত ছিল। নারবোনের ভিয়া দোমিসিয়া, নিমের রোমান স্থাপত্য, প্রাচীন সড়ক ও নগরব্যবস্থা তার সাক্ষ্য বহন করে। রোমান সাম্রাজ্য ভেঙে যাওয়ার বহু শতাব্দী পরেও রোমান নগরগুলো অদৃশ্য হয়নি। ভিসিগথ শাসন তাদের রাজনৈতিক কাঠামোকে নতুনভাবে ব্যবহার করেছিল। তারপর মুসলিম শাসকেরা সেই একই ভূগোলের ওপর নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছিল। অর্থাৎ সেপ্টিমেনিয়ার ইতিহাসকে একটি সভ্যতার আগমন এবং আরেকটির বিলুপ্তির গল্প হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বরং এটি একই ভূখণ্ডে ধারাবাহিক রাজনৈতিক স্তর জমে ওঠার ইতিহাস।
নারবোন ছিল সেই ব্যবস্থার কেন্দ্র, কিন্তু একমাত্র কেন্দ্র নয়। পূর্বদিকে এগোলে আসে বেজিয়ে। আরও দূরে মাগ্লন। উত্তরের দিকে নিম। পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমে কারকাসোনের দিকে পথ চলে গেছে। লোদেভও বৃহত্তর অঞ্চলের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ভূগোলের সঙ্গে যুক্ত ছিল। এই শহরগুলোর প্রতিটির মুসলিম নিয়ন্ত্রণের প্রকৃতি একই ছিল না, এবং সব জায়গায় মুসলিম শাসনের প্রত্যক্ষ প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণও সমান নয়। তাই এই অঞ্চলকে একটি সম্পূর্ণ, একক প্রশাসনিক প্রদেশ হিসেবে কল্পনা করার চেয়ে একটি বিস্তৃত মুসলিম-প্রভাবিত সীমান্ত অঞ্চল হিসেবে দেখা বেশি সঙ্গত।
বেজিয়ের দিকে এগোতে গেলে ট্রেনের জানালায় ভূদৃশ্য বদলে যায়। নারবোনের উপকূলীয় সমতলভূমি পেছনে পড়ে যায়, আঙুরের খেত আরও বিস্তৃত হয়, ছোট ছোট গ্রাম ও পুরোনো পাথরের বসতি দূরে চোখে পড়ে। এই অঞ্চল আজ ফরাসি ওয়াইন সংস্কৃতির জন্য বিখ্যাত। কিন্তু এই মাটির নিচে এবং পুরোনো নগরগুলোর স্মৃতিতে রয়েছে আরও বহু পুরোনো ইতিহাস। রোমানদের কৃষি ও বাণিজ্য, ভিসিগথ রাজনৈতিক কাঠামো, খ্রিস্টীয় গির্জার প্রসার এবং মুসলিম সামরিক উপস্থিতি—সবকিছু একই ভূদৃশ্যকে বিভিন্ন সময়ে ব্যবহার করেছে।
মুসলিম বাহিনীর কাছে এই শহরগুলোর গুরুত্বের একটি বড় কারণ ছিল যোগাযোগ। দক্ষিণ গলের পুরোনো রোমান সড়কগুলো তখনও সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে যায়নি। নগরগুলোর মধ্যে যোগাযোগ ছিল, নদীপথ ও উপকূলীয় জলপথ ব্যবহৃত হতো, আর পিরেনিজের ওপারে আল-আন্দালুসের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ ছিল। একটি সামরিক শক্তি যখন নতুন অঞ্চল দখল করে, তখন তাকে শুধু সৈন্য পাঠালেই হয় না; তাকে খাদ্য, অর্থ, সংবাদ এবং সৈন্যের চলাচলের পথও নিশ্চিত করতে হয়। সেপ্টিমেনিয়ার পুরোনো নগর ও সড়কব্যবস্থা সেই প্রয়োজন মেটাতে সহায়ক ছিল।
এই কারণেই আরবূনা থেকে সেপ্টিমেনিয়ার দিকে তাকালে একটি বিস্তৃত সামরিক মানচিত্র চোখের সামনে ভেসে ওঠে। নারবোন ছিল উপকূলের প্রবেশদ্বার। পশ্চিমে কারকাসোনের দিকে যাওয়ার পথ অভ্যন্তরীণ ভূখণ্ডের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করত। উত্তরে বেজিয়ে ও আরও পূর্বে নিমের দিকে এগিয়ে যাওয়া মানে রোন উপত্যকা ও দক্ষিণ-পূর্ব গলের দিকে নজর রাখা। আর দক্ষিণে ছিল পিরেনিজ ও তার ওপারে আল-আন্দালুস।
কিন্তু এই বিস্তার কতটা স্থায়ী ও প্রত্যক্ষ ছিল, সেটি নিয়ে সতর্ক থাকা জরুরি। মুসলিম বাহিনী কোনো একটি শহরে প্রবেশ করলেই সেখানে দীর্ঘমেয়াদি মুসলিম জনবসতি গড়ে উঠেছিল—এমন ধারণার পক্ষে সব জায়গায় যথেষ্ট প্রমাণ নেই। সামরিক অভিযান, অস্থায়ী সেনাছাউনি, কর আদায়, স্থানীয় অভিজাতদের আনুগত্য এবং রাজনৈতিক প্রভাব—এসবের মাত্রা জায়গাভেদে আলাদা হতে পারে। তাই সেপ্টিমেনিয়ার ইতিহাসে “মুসলিম নিয়ন্ত্রণ” শব্দটির অর্থ সব জায়গায় একই নয়।
এই পার্থক্যটি বোঝা জরুরি, কারণ এখানেই ইতিহাসের একটি প্রচলিত ভুল ধারণা জন্ম নেয়। কেউ যদি মনে করেন যে অষ্টম শতকের প্রথমার্ধে আজকের দক্ষিণ ফ্রান্সের বিস্তীর্ণ অঞ্চল একেবারে আন্দালুসের কোনো প্রদেশের মতো হয়ে গিয়েছিল, তাহলে তা অতিরঞ্জিত হবে। আবার বিপরীতভাবে যদি বলা হয় মুসলিমদের উপস্থিতি ছিল কেবল কয়েকটি সামরিক অভিযানের ঘটনা এবং স্থানীয় সমাজে তার কোনো রাজনৈতিক প্রভাব পড়েনি, সেটিও অসম্পূর্ণ। প্রকৃত চিত্রটি এই দুই চরম অবস্থানের মাঝখানে।
সেপ্টিমেনিয়া ছিল আল-আন্দালুসের উত্তর সীমান্ত।
এই সীমান্তের অর্থ ছিল সামরিক চাপ, রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়—তিনটিই। মুসলিম বাহিনী দক্ষিণ থেকে উত্তর দিকে অভিযান চালিয়েছে; ফ্রাঙ্কিশ শক্তি উত্তর থেকে দক্ষিণে পাল্টা চাপ সৃষ্টি করেছে; স্থানীয় অভিজাতরা পরিস্থিতি অনুযায়ী পক্ষ বদলেছে বা নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য সমঝোতা করেছে। কখনো যুদ্ধ হয়েছে, কখনো চুক্তি হয়েছে, কখনো কর আদায়ের ব্যবস্থা হয়েছে। এই পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে সাধারণ মানুষকে বেঁচে থাকতে হয়েছে।
সেপ্টিমেনিয়ার স্থানীয় গথ অভিজাতদের কথা এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মুসলিম বিজয়ের পর তাঁরা সবাই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাননি। বরং অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় ক্ষমতাবান পরিবার ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নতুন শাসকদের সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। মুসলিম শাসকের জন্য স্থানীয় প্রশাসনিক জ্ঞান, জমির মালিকানা, করব্যবস্থা এবং সামাজিক নেতৃত্বকে কাজে লাগানো সুবিধাজনক ছিল। অন্যদিকে স্থানীয় অভিজাতদের কাছেও নতুন শক্তির সঙ্গে সমঝোতা করা কখনো কখনো রাজনৈতিকভাবে লাভজনক হতে পারে। ফলে বিজয় ও সহযোগিতা, প্রতিরোধ ও সমঝোতা—সবকিছু পাশাপাশি চলেছিল।
খ্রিস্টান সমাজও এই সময় অদৃশ্য হয়ে যায়নি। গির্জা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় খ্রিস্টান জনগোষ্ঠী তাদের অস্তিত্ব বজায় রেখেছিল। মুসলিম শাসনের অধীনে খ্রিস্টান জনগোষ্ঠীর অবস্থান অঞ্চলভেদে ও সময়ভেদে পরিবর্তিত হয়েছে, কিন্তু দক্ষিণ ফ্রান্সে মুসলিম উপস্থিতি মানেই খ্রিস্টধর্মের বিলুপ্তি—এমন কোনো চিত্র ইতিহাস সমর্থন করে না। বরং আমরা দেখতে পাই, একটি খ্রিস্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজের ওপর মুসলিম রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, এবং সেই সমাজের সঙ্গে নতুন শাসকদের সম্পর্ক ছিল বাস্তব প্রয়োজন ও রাজনৈতিক সমঝোতার ওপর নির্ভরশীল।
এই জায়গায় সেপ্টিমেনিয়া আল-আন্দালুসের অন্যান্য সীমান্ত অঞ্চলের সঙ্গে তুলনীয় হয়ে ওঠে। সীমান্তে কোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থা কখনো কেন্দ্রের মতো হয় না। রাজধানী থেকে যত দূরে যাওয়া যায়, ততই স্থানীয় শক্তির গুরুত্ব বাড়ে। কর্ডোবা বা অন্য কোনো বৃহৎ নগরে বসে যে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তা পিরেনিজের উত্তরে এসে স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে বদলে যেতে পারে। একজন ওয়ালি বা সামরিক কমান্ডারের হাতে বাস্তব ক্ষমতা থাকলেও তাকে স্থানীয় অভিজাত, শহর, দুর্গ, গির্জা এবং বাণিজ্যপথের সঙ্গে সমন্বয় করতে হতো।
আর এখানেই “ভুলে যাওয়া আন্দালুস” কথাটির অর্থ খুঁজে পাওয়া যায়। সেপ্টিমেনিয়া কোনো দ্বিতীয় কর্ডোবা ছিল না। এখানে আল-আন্দালুসের মতো দীর্ঘস্থায়ী মুসলিম সভ্যতার নগরজীবন গড়ে ওঠেনি। কিন্তু কয়েক দশকের জন্য এই ভূখণ্ড এমন একটি রাজনৈতিক জগতের উত্তর প্রান্তে পরিণত হয়েছিল যার কেন্দ্র ছিল পিরেনিজের ওপারে। মুসলিম সামরিক ও প্রশাসনিক শক্তির উপস্থিতি, আরবি নাম, মুদ্রা, বাণিজ্যিক যোগাযোগ এবং রাজনৈতিক সম্পর্ক এই সীমান্তভূমিকে বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত করেছিল।
আজকের নিমস গেলে সেই সম্পর্কের কথা ভাবা আরও অদ্ভুত লাগে। শহরটি রোমান স্থাপত্যের জন্য বিখ্যাত—বিশাল রোমান আরেনা আর মেজোঁ কারের মতো নিদর্শন যেন দর্শককে সরাসরি রোমের দিকে ফিরিয়ে নেয়। ইতিহাস বলে, ৭২৫ সালে কারকাসোনের আত্মসমর্পণের পর নিমও উমাইয়া নিয়ন্ত্রণে চলে আসে; আর সেই রোমান আরেনা, যা ভিসিগথ আমলেই একটি দুর্গে রূপান্তরিত হয়েছিল, পরবর্তীকালে ৭৩৭ সালে শার্ল মার্তেলের বাহিনী ধ্বংস করে দেয়—কারণ তখন এটিকে মুসলিম প্রতিরক্ষার সম্ভাব্য ঘাঁটি হিসেবে গণ্য করা হচ্ছিল। আজকের পাথরের স্থাপত্যের সামনে দাঁড়িয়ে অষ্টম শতকের সেই রাজনৈতিক মানচিত্র কল্পনা করা কঠিন, অথচ শহরের অবস্থানই বলে দেয় কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। রোমান যুগ থেকে যে সড়ক ও নগরব্যবস্থা এখানে ছিল, তা মধ্যযুগের রাজনৈতিক শক্তিগুলোর কাছেও মূল্যবান ছিল।
আরও পশ্চিমে কারকাসোন। আজকের কারকাসোন তার বিশাল মধ্যযুগীয় দুর্গপ্রাচীরের জন্য বিশ্বখ্যাত। পর্যটকের চোখে এটি যেন ইউরোপীয় মধ্যযুগের একটি নিখুঁত দুর্গনগর। কিন্তু এর ইতিহাসও অনেক পুরোনো। ৭২৫ সালে উমাইয়া বাহিনীর অবরোধের মুখে স্থানীয় গথ শাসক শহরের অর্ধেক ভূখণ্ড ছেড়ে দিতে ও কর দিতে বাধ্য হন—যা দেখিয়ে দেয়, মুসলিম নিয়ন্ত্রণ সবসময় নারবোনের মতো সরাসরি সামরিক দখল ছিল না, কখনো কখনো তা ছিল আংশিক আত্মসমর্পণ ও করনির্ভর সমঝোতা। কারকাসোনকে তাই আরবূনার মতো নিশ্চিত মুসলিম প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না; তবে সেপ্টিমেনিয়ার অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ও রাজনৈতিক ভূগোলে এর অবস্থান ছিল গুরুত্বপূর্ণ। শহরটির দিকে তাকালে বোঝা যায়, দক্ষিণ ফ্রান্সের দুর্গ ও নগরগুলো কতটা গভীর ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার অংশ।
পূর্বদিকে মাগ্লনের ভূগোল আরও ভিন্ন। ভূমধ্যসাগরের উপকূলের কাছে এই অঞ্চল ধর্মীয় ও সামুদ্রিক যোগাযোগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। জলাভূমি, উপহ্রদ ও উপকূলীয় পথের কারণে এখানকার ভূগোল আজও বিশেষ। ইতিহাস বলে, বেজিয়ে ও আগদের পাশাপাশি মাগ্লনও উমাইয়াদের সঙ্গে সহযোগিতা করার অভিযোগে ৭৩৭ সালের পর শার্ল মার্তেলের বাহিনীর হাতে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিল। তবু এই ঘটনা থেকে দীর্ঘস্থায়ী প্রত্যক্ষ মুসলিম প্রশাসনের অস্তিত্ব প্রমাণিত হয় না—কোনো শহরকে মুসলিম প্রভাবের পরিসরে রাখা, আর সেখানে দীর্ঘস্থায়ী মুসলিম শাসনের প্রমাণ পাওয়া, এক কথা নয়।
সেপ্টিমেনিয়ার প্রকৃতি এই ইতিহাসের একটি নীরব অংশীদার। গ্রীষ্মের তীব্র রোদ, শুকনো মাটি, আঙুরের খেত, পাহাড়ের খাঁজ, উপকূলের লবণাক্ত জলাভূমি—এই সবকিছুই সেই সময়ও ছিল, যদিও মানুষের ব্যবহার ছিল আলাদা। আজকের পর্যটক যে পথ ধরে নারবোন থেকে বেজিয়ে, তারপর মোঁপ্লিয়ে বা নিমের দিকে যান, সেই বৃহত্তর ভূগোলের মধ্যেই একসময় সৈন্যদল অগ্রসর হয়েছে, দূত ছুটেছে, স্থানীয় অভিজাতরা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কোনো আধুনিক পথ আমাদের সেই প্রাচীন পথের সঙ্গে পুরোপুরি এক নয়, কিন্তু ভূগোলের দীর্ঘস্থায়িত্ব ইতিহাসকে বোঝার ক্ষেত্রে অমূল্য।
একটি বিশেষ বিষয় এখানে লক্ষ করার মতো। সেপ্টিমেনিয়ায় মুসলিম শাসন খুব বেশি দিন স্থায়ী হয়নি, কিন্তু তার রাজনৈতিক প্রভাব ছিল তার স্থায়িত্বের তুলনায় অনেক বেশি। মুসলিম বাহিনীর উপস্থিতি ফ্রাঙ্কিশ শাসকদের জন্য একটি নতুন নিরাপত্তা-সমস্যা তৈরি করেছিল। পিরেনিজের ওপার থেকে আসা একটি শক্তি এখন তাদের রাজ্যের দক্ষিণ সীমান্তে উপস্থিত। ফলে দক্ষিণ ফ্রান্স আর কেবল স্থানীয় গথ রাজনীতি বা আঞ্চলিক সংঘর্ষের বিষয় রইল না; এটি বৃহত্তর ফ্রাঙ্কিশ-মুসলিম প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ হয়ে উঠল।
এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার সবচেয়ে বিখ্যাত প্রতিধ্বনি পাওয়া যায় ৭৩২ সালের তুর বা পোয়াতিয়ের যুদ্ধকে ঘিরে। কিন্তু সেপ্টিমেনিয়ার ইতিহাসের ক্ষেত্রে শুধু সেই যুদ্ধের দিকে তাকালে একটি বড় অংশ বাদ পড়ে যায়। কারণ মুসলিম ও ফ্রাঙ্কিশ শক্তির সংঘর্ষ কোনো একদিনের যুদ্ধ দিয়ে নির্ধারিত হয়নি। দক্ষিণ ফ্রান্সে মুসলিম উপস্থিতি, সীমান্ত অভিযান, স্থানীয় বিদ্রোহ, শহরগুলোর আনুগত্য এবং পরবর্তী ফ্রাঙ্কিশ পুনর্দখল—এই দীর্ঘ প্রক্রিয়াই আসল ইতিহাস। তুরের যুদ্ধ তার বৃহত্তর সংঘর্ষের একটি বিখ্যাত অধ্যায় মাত্র।
শেষ পর্যন্ত পেপিন দ্য শর্টের সময় ফ্রাঙ্কিশ শক্তি দক্ষিণের দিকে ক্রমশ অগ্রসর হয়। নারবোন দীর্ঘ অবরোধের পর ৭৫৯ সালে ফ্রাঙ্কিশ নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। এর মাধ্যমে সেপ্টিমেনিয়ায় মুসলিম রাজনৈতিক কর্তৃত্বের অবসান ঘটে। কিন্তু শহর দখল করার সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাসের সব চিহ্ন মুছে যায়নি। স্থানীয় সমাজ টিকে থাকে, পুরোনো পথ টিকে থাকে, জমির মালিকানা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান টিকে থাকে, আর নতুন শাসকেরা পুরোনো কাঠামোর ওপর নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে।
এই জায়গায় এসে সেপ্টিমেনিয়ার ইতিহাস আবার নারবোনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। আরবূনা ছিল দরজা; সেপ্টিমেনিয়া ছিল সেই দরজার ওপারের ভূখণ্ড। নারবোনে যে মুসলিম উপস্থিতি আমরা দেখেছি, তার প্রকৃত অর্থ বুঝতে হলে এই বৃহত্তর অঞ্চলকে দেখতে হয়। কারণ একটি শহর কখনো একা ইতিহাস তৈরি করে না। তার চারপাশের পথ, নদী, কৃষিজমি, পাহাড়, বন্দর, দুর্গ এবং প্রতিবেশী শহরগুলো তাকে রাজনৈতিক অর্থ দেয়।
আজকের দক্ষিণ ফ্রান্সে ভ্রমণ করলে এই ইতিহাসের কোনো সরল দৃশ্য চোখে পড়ে না। মোঁপ্লিয়ের আধুনিক নগরজীবন, নিমের রোমান স্মৃতিস্তম্ভ, কারকাসোনের দুর্গ, বেজিয়ের ক্যাথিড্রাল, নারবোনের কানাল দ্য লা রোবিন—সবকিছু যেন আলাদা আলাদা সময়ের প্রতিনিধিত্ব করে। কিন্তু এগুলোকে যদি একই মানচিত্রে বসানো যায়, তখন বোঝা যায় যে একসময় এই সব শহর একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক ভূগোলের অংশ ছিল। সেই ভূগোলের নাম সেপ্টিমেনিয়া।
আর তাই এই অঞ্চলকে “ফ্রান্সের এক ভুলে যাওয়া আন্দালুস” বলা যায়—তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্তে। এটি আন্দালুস ছিল না কর্ডোবার অর্থে; ছিল না শতাব্দীব্যাপী মুসলিম সভ্যতার কেন্দ্র; ছিল না এমন কোনো অঞ্চল যেখানে মুসলিম জনসংখ্যা ও স্থাপত্য দীর্ঘকাল ধরে আধিপত্য বিস্তার করেছিল। এটি ছিল আন্দালুসের উত্তর সীমান্ত—একটি অস্থায়ী, পরিবর্তনশীল, সামরিক ও রাজনৈতিক সীমান্তভূমি। এর গুরুত্ব ঠিক এখানেই।
সীমান্ত কখনো কেবল বিভাজন করে না; সীমান্ত সংযোগও তৈরি করে। সেপ্টিমেনিয়া সেই সংযোগের একটি অসাধারণ উদাহরণ। এখানে আরবি ও লাতিন জগতের যোগাযোগ ঘটেছে, মুসলিম ও খ্রিস্টান রাজনৈতিক শক্তি মুখোমুখি হয়েছে, গথ ঐতিহ্য নতুন শাসনের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে, রোমান সড়ক নতুন সামরিক অভিযানে ব্যবহৃত হয়েছে, আর ভূমধ্যসাগরীয় বাণিজ্যপথ বৃহত্তর ইউরোপীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থেকেছে।
আজ আমরা যখন নারবোন থেকে মোঁপ্লিয়ের দিকে ট্রেনে যাই, জানালার দুই পাশে আঙুরের খেত দেখি, দূরে পাহাড় দেখি, কখনো পুরোনো গির্জার চূড়া চোখে পড়ে, তখন এই দৃশ্যের মধ্যে আরবূনার কোনো পতাকা দেখা যায় না। কোনো মিনার নেই, কোনো আরবি প্রাসাদ নেই, কোনো বিশাল মুসলিম দুর্গও নেই। ইতিহাস যেন নিজের অস্তিত্ব মুছে ফেলেছে।
কিন্তু ভূদৃশ্য ইতিহাসকে পুরোপুরি ভুলে যায় না।
যে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে আজ পর্যটক ছবি তোলেন, সেই সমুদ্রই একসময় মুসলিম ও খ্রিস্টান বিশ্বের মধ্যে যোগাযোগের পথ ছিল। যে পাহাড় আজ পর্যটকের চোখে কেবল সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য, সেই পাহাড়ই ছিল রাজ্য ও সাম্রাজ্যের সীমানা। যে শহর আজ ফরাসি, সেটিই কোনো এক সময় ভিসিগথ ছিল; তারপর মুসলিম রাজনৈতিক জগতের অংশ হয়েছিল; পরে আবার ফ্রাঙ্কিশ হয়ে উঠেছিল। নাম বদলেছে, পতাকা বদলেছে, শাসক বদলেছে—কিন্তু শহর ও ভূগোল থেকে গেছে।
সেপ্টিমেনিয়ার ইতিহাস তাই বিজয় ও পরাজয়ের সরল কাহিনি নয়। এটি ইউরোপের দক্ষিণ সীমান্তে কয়েক দশকের এক অস্থির সময়ের ইতিহাস, যখন আল-আন্দালুস তার উত্তরের প্রান্তকে পিরেনিজের ওপারে প্রসারিত করেছিল এবং ফ্রাঙ্কিশ রাজ্য সেই অগ্রযাত্রাকে থামানোর চেষ্টা করেছিল। এই সময়টি সংক্ষিপ্ত, কিন্তু তার স্মৃতি ইউরোপীয় ইতিহাসের বৃহত্তর প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত—ইসলাম ও খ্রিস্টধর্মের সম্পর্ক, ভূমধ্যসাগরীয় বাণিজ্য, সীমান্ত রাজনীতি, সামরিক অভিযানের প্রকৃতি এবং স্থানীয় সমাজের অভিযোজন।
আর এই কারণেই নারবোন থেকে সেপ্টিমেনিয়ার পথে যাত্রা আসলে একটি শহর থেকে আরেক শহরে যাওয়া নয়। এটি একটি হারিয়ে যাওয়া রাজনৈতিক ভূগোলের মধ্যে প্রবেশ করা। আজকের ফরাসি দক্ষিণের শান্ত, রৌদ্রোজ্জ্বল, দ্রাক্ষাক্ষেত্রে ভরা ভূদৃশ্যের নিচে যে ইতিহাস চাপা পড়ে আছে, তার একটি অধ্যায়ের নাম আরবূনা; আর সেই অধ্যায়ের বৃহত্তর ভূখণ্ডের নাম—সেপ্টিমেনিয়া।
একসময় এই ভূখণ্ড ছিল আন্দালুসের উত্তর সীমান্ত। আজ তা ফ্রান্সের দক্ষিণ। আর ইতিহাসের দীর্ঘ পথে এই দুই পরিচয়ের মাঝখানেই লুকিয়ে আছে সেপ্টিমেনিয়ার বিস্মৃত গল্প।
সুমন মাহমুদ
লেখক ও গবেষক




