Home ইতিহাস ফ্রান্সের নিমসের মাটির নিচে ঘুমিয়ে আছে আন্দালুসিয়ার আরেক ইতিহাস

ফ্রান্সের নিমসের মাটির নিচে ঘুমিয়ে আছে আন্দালুসিয়ার আরেক ইতিহাস

25
0


নারবোন থেকে পূর্ব-উত্তর দিকে এগিয়ে কারকাসোনের দুর্গনগরী পেছনে ফেলে যখন নিমসের দিকে রওয়ানা হই, তখন মনে হয় যেন ইতিহাসের আরেকটি স্তরে প্রবেশ করছি। নারবোন থেকে নিমসের পথে এগোতে এগোতে দৃশ্যপট যেন ধীরে ধীরে বদলে যায়। একদিকে দূরে ভূমধ্যসাগরের নীলাভ উপস্থিতি, অন্যদিকে আঙুরখেত, জলপাইগাছ আর দক্ষিণ ফ্রান্সের শান্ত গ্রামগুলো পথের দুই ধার জুড়ে ছড়িয়ে আছে। কোথাও বিস্তীর্ণ সমতল, কোথাও নিম্ন পাহাড়ের রেখা—আর সেই পথের বুক দিয়েই যেন অদৃশ্যভাবে হেঁটে চলে ইতিহাস। ভাবতে ভালো লাগে, আজ যে আধুনিক সড়ক ধরে আমি এগিয়ে চলেছি, প্রায় তেরো শতাব্দী আগে এই অঞ্চলের কাছাকাছি পথ দিয়েই আল-আন্দালুসের মুসলিম বাহিনী উত্তরমুখী হয়েছিল। আজ পথ শান্ত, গাড়ির শব্দে মুখর; অথচ এই একই ভূমি একসময় ছিল সাম্রাজ্যের অগ্রযাত্রা, যুদ্ধ এবং ইতিহাস বদলে দেওয়ার সাক্ষী। পথের দূরত্ব প্রায় দুই ঘন্টা। আমরা কারকাসোনের সঙ্গে প্রথম পরিচয় হয়েছিলাম দুর্গপ্রাচীর দিয়ে; নিমসের সঙ্গে হয়েছে পাথরের বিশাল এক অ্যাম্ফিথিয়েটার দিয়ে। শহরের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে থাকা সেই রোমান স্থাপত্য যেন এখনও ঘোষণা করে—এই শহরের ইতিহাসের শুরু মধ্যযুগে নয়, তারও বহু শতাব্দী আগে। কিন্তু নিমসের ইতিহাসের সবচেয়ে বিস্ময়কর অধ্যায়টি রোমান সাম্রাজ্যের নয়।

সেটি সাড়ে তিন হাত মাটির নিচে।
রোমান অ্যাম্ফিথিয়েটারের শহরে, আধুনিক নগরজীবনের খুব কাছেই, প্রত্নতাত্ত্বিকেরা এমন কয়েকটি মুসলিম কবর আবিষ্কার করেছেন, যা দক্ষিণ ফ্রান্সে মুসলিম উপস্থিতির ইতিহাসকে একেবারে নতুনভাবে দেখার সুযোগ করে দিয়েছে। যখন অষ্টম শতকের প্রথমার্ধে মুসলিম বাহিনী পিরেনিজ অতিক্রম করে সেপ্টিমেনিয়ায় প্রবেশ করেছিল তখন নারবোন হয়েছিল তাদের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। কারকাসোনসহ আশপাশের আরও কিছু শহর মুসলিম রাজনৈতিক ও সামরিক অগ্রযাত্রার আওতায় এসেছিল। নিমসও প্রায় ৭২৫ সাল থেকে মুসলিম প্রভাবের আওতায় আসে বলে ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, আর সেই উপস্থিতি টিকে ছিল ৭৩৭ সাল পর্যন্ত, যখন শার্ল মার্তেলের বিশাল বাহিনী শহরটি আক্রমণ করে প্রায় ধ্বংস করে দেয়। কিন্তু লিখিত সূত্রের কথা এক জিনিস, আর মাটির নিচে মানুষের শরীরের অবশেষ পাওয়া সম্পূর্ণ অন্য জিনিস।
কারণ একটি কবর ইতিহাসকে অন্যভাবে কথা বলতে বাধ্য করে। কোনো রাজা বা সেনাপতির নাম সেখানে লেখা নেই। কোনো যুদ্ধের বর্ণনা নেই। কোনো সাম্রাজ্যের সীমানা আঁকা নেই। আছে শুধু কিছু মানুষ—যারা কোনো একদিন বেঁচেছিলেন, কোনো এক সম্প্রদায়ের অংশ ছিলেন, তারপর মারা গিয়েছিলেন এবং নির্দিষ্ট একটি রীতিতে তাঁকে মাটির নিচে সমাহিত করা হয়েছিল। নিমসের মুসলিম কবরগুলোর তাৎপর্য ঠিক এখানেই।
আজকের নিমস শহরটি রোমান উত্তরাধিকারের জন্য বিখ্যাত। শহরের কেন্দ্র দিয়ে হাঁটলে মনে হয়, রোমান সাম্রাজ্য এখনও চলে যায়নি। বিশাল অ্যাম্ফিথিয়েটার—আরেন দ্য নিম —আজও দাঁড়িয়ে আছে। মেজোঁ কারে -র মন্দিররূপী স্থাপত্য রোমান প্রকৌশল ও নান্দনিকতার আরেক অসাধারণ নিদর্শন। শহরের অন্যত্র রোমান অতীতের স্পষ্ট ছাপও ছড়িয়ে আছে। আধুনিক ক্যাফে, দোকান, রাস্তা ও মানুষের ভিড়ের মাঝখানে হঠাৎ কোনো প্রাচীন পাথরের দেয়াল বা স্থাপত্য সামনে এসে দাঁড়ায়, আর সময়ের ধারণা বদলে যায়।
কিন্তু নিমস শুধু রোমান শহর নয়। রোমানদের পরে এসেছে ভিসিগথ যুগ। তারপর অষ্টম শতকের ইউরোপের ইতিহাস বদলে দেয়া রাজনৈতিক অস্থিরতা। পিরেনিজের দক্ষিণে মুসলিম শাসনের দ্রুত বিস্তার। তারপর সেই শক্তির উত্তরে অগ্রযাত্রা। সেপ্টিমেনিয়ার বিভিন্ন শহরের মতো নিমসও এই পরিবর্তনশীল সীমান্ত-রাজনীতির মধ্যে এসে পড়ে।
২০০৬ থেকে ২০০৭ সালের মধ্যে নিমস শহরের একটি প্রারম্ভিক মধ্যযুগীয় সমাধিক্ষেত্র খননকালে প্রত্নতাত্ত্বিকেরা তিনটি কবর শনাক্ত করেন, যেগুলোর সমাধির ধরন গবেষকদের বিশেষভাবে আকর্ষণ করে। তিনটি মৃতদেহকেই ডান কাত করে শোয়ানো হয়েছিল, মুখ দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অর্থাৎ মক্কার দিকে ফেরানো, হাত সোজা প্রসারিত এবং পা কোথাও সোজা, কোথাও একটির ওপর আরেকটি রাখা—ইসলামি দাফনরীতির সঙ্গে যা সরাসরি সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে প্রত্নতাত্ত্বিকেরা মনে করেন।
নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে এখানে একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাসের ক্ষেত্রে কয়েকটা লক্ষণ থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো বিপজ্জনক। সে হিসেবে মৃতদেহের দিকনির্দেশ একা কোনো ব্যক্তির ধর্মীয় পরিচয় প্রমাণ করে না। কিন্তু যখন কবরের বিন্যাস, দেহের অবস্থান, প্রত্নতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট, সময়কাল এবং জিনগত তথ্য একসঙ্গে বিবেচনা করা হয়, তখন একটি অনেক বেশি শক্তিশালী ছবি তৈরি হয়।
নিমসের এই কবরগুলোর ক্ষেত্রেও ঠিক সেটিই ঘটেছে।
গবেষণায় মৃতদের বয়স, লিঙ্গ, কবরের ধরন এবং জিনগত পরিচয় বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষকদের মতে, তিনটি কবরেই প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের দেহাবশেষ পাওয়া গিয়েছিল। হাড়ের রেডিওকার্বন পরীক্ষায় সময়কাল দাঁড়ায় সপ্তম থেকে অষ্টম শতাব্দীর মধ্যে—অর্থাৎ ফ্রান্সে পরিচিত অন্য যেকোনো মুসলিম কবরের চেয়ে প্রায় চারশো বছর পুরোনো, এখন পর্যন্ত জানা সবচেয়ে প্রাচীন মধ্যযুগীয় মুসলিম কবর। কোনো দেহেই সহিংস মৃত্যুর স্পষ্ট চিহ্ন পাওয়া যায়নি, তবে একজনের কব্জির হাড়ে এমন একটি বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায় যা সাধারণত আফ্রিকীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে বেশি দেখা যায়। প্রাচীন ডিএনএ বিশ্লেষণে মাতৃসূত্রে তিনটি পৃথক আফ্রিকীয় বংশরেখা এবং পিতৃসূত্রে মাগরিবীয়—অর্থাৎ উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকার—বংশধারার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এই তথ্যটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ অষ্টম শতকের মুসলিম বাহিনীতে উত্তর আফ্রিকার—বিশেষত মাগরিব অঞ্চল থেকে আসা বার্বার সৈনিকদের উল্লেখ ঐতিহাসিকভাবে সুপরিচিত ও স্বীকৃত। গবেষক দলের প্রধান ইভ গ্লেইজ ও তাঁর সহকর্মীরা মত প্রকাশ করেন, এই তিনজন সম্ভবত উমাইয়া বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত বার্বার সৈনিক ছিলেন, যাঁরা উত্তর আফ্রিকা বিজয়ের পর সেই বাহিনীর সঙ্গেই ইউরোপে এসে পৌঁছেছিলেন। লিখিত ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব এবং জিনগত গবেষণা যেন একই বিন্দুতে এসে মিলিত হয়।
নিমসের মাটির নিচে পাওয়া কয়েকটি কবর সেই ইতিহাসকে মানুষের শরীরের মাধ্যমে স্পর্শযোগ্য করে তোলেছে।
এঁরা কারা ছিলেন? আমরা তাঁদের নাম জানি না। তাঁরা কোনো বিখ্যাত সেনাপতি ছিলেন কি না, জানা যায় না। কোনো সাধারণ সৈন্য, কোনো ছোট সামরিক দলের সদস্য, না কি মুসলিম সম্প্রদায়ের অন্য কোনো মানুষ—সেটিও নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। তাঁদের জীবনের গল্প ইতিহাসের পৃষ্ঠায় লেখা হয়নি।
কিন্তু তাঁদের মৃত্যুর রীতি একটি গল্প বলে।
তাঁদের এমনভাবে কবরস্থ করা হয়েছিল, যা গবেষকদের মতে মুসলিম দাফনক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। অর্থাৎ তাঁরা শুধু দক্ষিণ ফ্রান্সের মধ্য দিয়ে যাওয়া কোনো অজ্ঞাত ভ্রমণকারী ছিলেন—এমন সাধারণ ধারণা যথেষ্ট নয়। তাঁদের সমাধির ধরন ইঙ্গিত দেয় যে তাঁদের ধর্মীয় পরিচয় এবং দাফনক্রিয়ার নিয়ম সেই সময়ও গুরুত্ব বহন করত। এখানেই নিমসের কবরগুলো অষ্টম শতকের ইতিহাসকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
আমরা সাধারণত বিজয়ের ইতিহাসকে শহর দখলের মাধ্যমে দেখি। কে কাকে পরাজিত করল, কোন রাজা কোন শহর দখল করল, কোন বছরে কোন বাহিনী কোথায় পৌঁছল—ইতিহাসের বড় কাঠামো প্রায়ই এভাবেই লেখা হয়। কিন্তু একটি কবর সেই ইতিহাসের আকার ছোট করে দেয়। সাম্রাজ্যের বদলে সেখানে একজন মানুষ। সেনাবাহিনীর বদলে একটি শরীর। রাজনৈতিক সীমানার বদলে মাটির নিচে শুয়ে থাকা একটি নীরব উপস্থিতি। নিমসের এই তিনটি কবর সেই নীরবতার মধ্যেই কথা বলে যারা হাজারো অজ্ঞাত কবরের খুব সাধারণ প্রতিনিধি মাত্র।
আমার কল্পনায় ভেসে উঠে, প্রায় তেরোশো বছর আগে কোনো এক সময় এই মুসলিম মানুষগুলো এই শহর বা এর আশপাশে ছিল। তাঁরা মারা গিয়েছিলেন বা নিহত হয়েছিলেন। তাঁদের দেহ এমন একটি রীতিতে সমাহিত করা হয়েছিল, যা তাঁদের পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত। তারপর শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তাঁদের ওপর দিয়ে নতুন পৃথিবী গড়ে উঠেছে। মুসলিম রাজনৈতিক উপস্থিতি শেষ হয়েছে। ফ্রাঙ্কিশ শক্তি অঞ্চলটি পুনর্দখল করেছে। মধ্যযুগ কেটেছে। আধুনিক ফ্রান্স গড়ে উঠেছে। রোমান অ্যাম্ফিথিয়েটার পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। আর মাটির নিচে সেই মানুষগুলো অপেক্ষা করেছে।
এই আবিষ্কারের আরেকটি বড় গুরুত্ব হলো, এটি মুসলিম উপস্থিতির প্রকৃতি নিয়ে নতুন প্রশ্ন তোলে। নিমসে কি স্থায়ী কোন মুসলিম সম্প্রদায় ছিল? নাকি এই মানুষগুলো ছিল কোনো সামরিক সেনাদলের সদস্য? তাঁরা কি স্থানীয়ভাবে কয়েক বছর অবস্থান করেছিলেন? নাকি কোনো সামরিক অভিযানের সময় মারা গিয়েছিলেন?
এই প্রশ্নগুলোর সবগুলোর উত্তর আমার কাছে নেই। গবেষকেরা নিজেরাই বলেন, আইসোটোপ বিশ্লেষণের মতো আরও পরীক্ষা ছাড়া এই তিনজন সরাসরি উত্তর আফ্রিকা থেকে এসেছিলেন, নাকি আইবেরীয় উপদ্বীপে বেড়ে ওঠা দ্বিতীয় প্রজন্মের মুসলিম বংশধর ছিলেন, তা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। তিনটি কবর থেকে একটি সম্পূর্ণ সমাজের ছবি আঁকা সম্ভব নয়। এটিই গবেষণার সতর্কতা। কিন্তু একই সঙ্গে এই কবরগুলোকে কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলেও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কারণ এগুলো সেই সময়ের লিখিত ইতিহাসের সঙ্গে এমনভাবে মিলে যায়, যা দক্ষিণ ফ্রান্সে মুসলিম উপস্থিতির বাস্তবতাকে আরও শক্তিশালী করে।
আজকের নিমসের ক্ষেত্রে তাই আমরা তিনটি স্তরের ইতিহাস দেখতে পাই। প্রথমটি রোমান। অ্যাম্ফিথিয়েটার, মন্দির, রাস্তা, প্রকৌশল এবং নগরজীবনের ইতিহাস। দ্বিতীয়টি ভিসিগথ ও প্রারম্ভিক মধ্যযুগীয়। রোমান রাজনৈতিক বিশ্বের পতনের পর নতুন শাসন, নতুন ক্ষমতার কাঠামো এবং খ্রিস্টীয় সমাজের ইতিহাস। আর তৃতীয়টি সেই সংক্ষিপ্ত কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম উপস্থিতি। এই তিনটি স্তর একে অপরকে মুছে দেয়নি। বরং একটির ওপর আরেকটি জমেছে।
আজ নিমসের রাস্তায় হাঁটলে প্রথমে চোখে পড়ে রোমান সভ্যতার চিহ্ন। কিন্তু একটু গভীরে গেলে পাওয়া যায় ভিসিগথ অতীত। আর প্রত্নতাত্ত্বিক খননের মাটির নিচে আরও একটি ইতিহাস অপেক্ষা করে—যে ইতিহাস বলে, অষ্টম শতকের কোনো এক সময়ে এই শহরের সঙ্গে মুসলিম বিশ্বের মানুষের বাস্তব যোগাযোগ ছিল।
এই আবিষ্কার দক্ষিণ ফ্রান্সের মুসলিম ইতিহাস সম্পর্কে আমার ধারণাকেও বদলে দিয়েছে। কারণ, অনেক সময় পিরেনিজের উত্তরে মুসলিম উপস্থিতিকে কেবল একটি সামরিক অভিযানের ইতিহাস হিসেবে দেখা হয়। যেন বাহিনী দক্ষিণ থেকে এলো, কিছু যুদ্ধ করল, তারপর আবার ফিরে গেল। কিন্তু নিমসের কবরগুলো দেখায়, ইতিহাস সবসময় এত সরল নয়। কোনো সামরিক উপস্থিতির অর্থ মানুষও। সেই মানুষের খাবার লাগে, বিশ্রাম লাগে, অসুস্থতা হয়, মৃত্যু হয়। সৈন্য বা প্রশাসকেরা শুধু মানচিত্রের তীরচিহ্ন নয়; তাঁরা রক্তমাংসের মানুষ। আর একজন মানুষ যখন মৃত্যুর পর নিজের ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী সমাহিত হয়, তখন সেই উপস্থিতি আরও গভীর হয়ে ওঠে।
কিন্তু ঠিক আরেক কারণেই নিমসের কবরগুলো আরও মূল্যবান। কারণ সীমান্তের ইতিহাস সাধারণত রাজধানীর ইতিহাসের মতো দৃশ্যমান হয় না। রাজধানীতে প্রাসাদ থাকে, মসজিদ থাকে, দলিল থাকে, প্রশাসনিক রেকর্ড থাকে। সীমান্তে অনেক সময় থাকে ভাঙা মুদ্রা, পোড়ামাটির টুকরো, অস্ত্রের অংশ, দুর্গের স্তর, অথবা কোনো অচেনা মানুষের কবর। সেই কবরই কখনো কখনো পুরো ইতিহাসের দিক পরিবর্তন করে দেয়।
নিমসে দাঁড়িয়ে রোমান অ্যাম্ফিথিয়েটারের দিকে তাকালে এই দ্বৈত অনুভূতি আরও প্রবল হয়। একদিকে পাথরের বিশাল স্থাপত্য—দুই হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে মানুষের চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। অন্যদিকে কয়েকটি কবর—যেগুলো শতাব্দীর পর শতাব্দী সম্পূর্ণ অদৃশ্য ছিল। একটি ইতিহাস এত দৃশ্যমান যে তাকে এড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব। অন্য ইতিহাস এত অদৃশ্য যে তাকে খুঁজে পেতে হয়েছে মাটি খুঁড়ে। সম্ভবত এটাই দক্ষিণ ফ্রান্সে মুসলিম উপস্থিতির সবচেয়ে উপযুক্ত প্রমাণ।
রোমান ইতিহাস দেয়ালের ওপর প্রোথিত।
মুসলিম ইতিহাস মাটির নিচে সমাহিত।
নিমসের পুরোনো শহরের মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে মনে হয়, ইতিহাসের দৃশ্যমানতা কখনো তার গুরুত্বের সমানুপাতিক নয়। কোনো সভ্যতা বিশাল স্থাপত্য রেখে যায়, আর কোনো উপস্থিতি রেখে যায় মাত্র কয়েকটি মুদ্রা, কয়েকটি কবর এবং কিছু বিচ্ছিন্ন লিখিত উল্লেখ। কিন্তু সেই সামান্য চিহ্নও যথেষ্ট হতে পারে একটি ভুলে যাওয়া অধ্যায়কে আবার সামনে নিয়ে আসার জন্য।
রোমানরা একটি শহর গড়ে তুলেছিল। ভিসিগথরা তাকে নিজেদের রাজনৈতিক জগতের অংশ করেছিল। মুসলিম বাহিনী সেখানে পৌঁছেছিল। কয়েকজন মানুষ সেখানে মারা গিয়েছিল। তারপর ফ্রাঙ্কিশ শক্তি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করেছিল। শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে আধুনিক ফ্রান্স গড়ে উঠেছে। কিন্তু মাটির নিচে, ইতিহাসের সব পরিবর্তনের নিচে, রয়ে গেছে সেই কবরগুলো।
আর নিমসে দাঁড়িয়ে বোঝা যায়—কখনো কখনো একটি সাম্রাজ্যের উপস্থিতির সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ কোনো প্রাসাদ নয়।
একটি নীরব কবর।

পড়ুনঃ  একটি সভ্যতার দীর্ঘ নিঃশ্বাস থেমে যাওয়ার স্মৃতিবাহী দিন।

সুমন মাহমুদ
লেখক ও গবেষক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here