আগস্ট মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত ৭, আহত ৫৩৬
• মব সহিংসতায় নিহত ২৮, আহত ৬২
• নির্যাতনের শিকার ২৪৯ নারী ও শিশু
• নির্যাতন ও হয়রানির শিকার ৪৫ সাংবাদিক
ঢাকা, ০৩ সেপ্টেম্বর: চলতি বছরের আগস্ট মাসে সারাদেশে রাজনেতিক সহিংসতার ঘটনায় দলীয় কোন্দল ও অন্তর্কোন্দলে ৭ জন নিহত এবং ৫৩৬ জনের অধিক বিভিন্ন দলের নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষ আহত হয়েছেন।
সোমবার (৩ সেপ্টেম্বর) গণমাধ্যমে প্রেরিত এক সংবাদি বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছেন মানবাধিকার সংগঠন ‘হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি–এইচআরএসএস’।
প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের ১৬ টি জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ এবং হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) এর সংগৃহীত তথ্য ও ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং রিপোর্টের ভিত্তিতে ২০২৬ সালের আগস্ট মাসের মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট মাসে ৭০ টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৭ জন এবং আহত হয়েছেন ৫৩৬ জন। আগস্ট মাসে মাসে রাজনৈতিক সহিংসতা ও হতাহতের সংখ্যা জুলাই মাসের তুলনায় বেড়েছে । গত জুলাই মাসে ৪৫ টি “রাজনৈতিক সহিংসতার” ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৬ জন এবং আহত হয়েছেন ১৬৪ জন।
আগস্ট মাসে সহিংসতার অন্তত ৭০টি ঘটনার মধ্যে বিএনপির অন্তর্কোন্দলে ২০টি ঘটনায় আহত হয়েছেন কমপক্ষে ১৫২ জন ও নিহত ৫ জন। ১৮ টি বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ২৩৩ জন ও নিহত ১ জন। ৭ টি বিএনপি-আওয়ামী লীগের মধ্যে সংঘর্ষে আহত ২৬ জন ও নিহত ১ জন। । ৬ টি বিএনপি-এনসিপি মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ১৬ জন, ১০ টি বিএনপি-অন্যান্য দলের মধ্যে সংঘর্ষে ৩৮ জন আহত হয়েছেন। বিভিন্ন দলের মধ্যে ৯ টি ঘটনায় আহত হয়েছেন ৭১ জন । নিহত ৭ জনের মধ্যে বিএনপির ৫ জন, আওয়ামী লীগের ১ জন ও জামায়াতের ১ জন।
এসকল ঘটনার মধ্যে ক্যাম্পাস কেন্দ্রীক ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে সংঘর্ষের অন্তত ১৩ টি ঘটনায় আহত হয়েছে ২১৬ জন। এর মধ্যে ছাত্রদল-শিবির ৮ টি ঘটনায় ১৮১ জন এবং ছাত্রদল, অন্যান্য ছাত্র সংগঠন ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৫টি ঘটনায় ৩৫ জন আহত হয়েছে।
‘আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ ও হামলা, দলীয় ও অন্তকোন্দল, ও চাঁদাবাজি কেন্দ্রিক অধিকাংশ সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ওপর পৃথক হামলা, গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা এবং দেশের কয়েকটি জেলায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে’ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর পাশাপাশি দুষ্কৃতকারীদের দ্বারা রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা-কর্মীদের ওপর হামলার অন্তত ৪ টি ঘটনায় ৩ জন আহত এবং ২ জন নিহত হযেছেন। অন্তত ১২ জন রাজনৈতিক নেতা-কর্মী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। এছাড়াও সারাদেশে আধিপত্য বিস্তার, দখলদারিত্ব, রাজনৈতিক সহিংসতা ও চাঁদাবাজি কেন্দ্রীক ১৯ টি ঘটনায় অর্ধশতাধিক বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, দলীয় কার্যালয়ে সংঘর্ষ, হামলা, লুটপাট, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রার্থী ও তাঁদের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সহিংসতা ও হামলার ঘটনাও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। আগস্ট মাসে কুষ্টিয়া ও সাতক্ষীরায় স্থানীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে অন্তত ৯ জন আহত হয়েছে।
এছাড়া, রাজনৈতিক মামলার বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, এ মাসে বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের নামে ৬২ টির অধিক মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ১১২৫ জনের নাম উল্লেখ করে এবং আরও প্রায় ২২০৯ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। এছাড়া, একই মাসে রাজনৈতিক ও অন্যান্য মিলিয়ে মোট ১৬২ টি ঘটনায় ১২৮২৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে আওয়ামী লীগের অন্তত ৪২৯ জন নেতাকর্মী, বিএনপির ২২ জন, জামায়াতে ইসলামির ৪ জন, এনসিপির ৯ জন এবং উগ্রপন্থী সংগঠনের ৫ জন সদস্য রয়েছে।
মব সহিংসতা ও গণপিটুনীর ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, এ মাসে গণপিটুনী ও মব সহিংসতায় সারাদেশ চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, বাক-বিতন্ডা, আধিপত্য বিস্তার, ধর্মীয় অবমাননাসহ নানা অভিযোগে গণপিটুনী ও মব সহিংসতার কমপক্ষে ৫৩ টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন অন্তত ২৮ জন এবং আহত হয়েছেন ৬২ জন।
আগস্ট মাসে সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনার তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়েছে, এ মাসে অন্তত ৩২ টি নির্যাতনের ঘটনায় কমপক্ষে ৪৫ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এ সকল ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্ততপক্ষে ২৬ জন, লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন ৬ জন, হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন ৭ জন সাংবাদিক। ৫ জন সাংবাদিককে আটক করা হয়েছে। এছাড়া সংবাদ প্রকাশের জেরে ১ টি মামলায় ১ জন সাংবাদিককে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬ এর আওয়ায় ১টি মামলা ১জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
সভা সমাবেশ ও মত প্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, এ মাসে ১৩ টি সভা ও সমাবেশ আয়োজনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বাধা প্রদান করে, এতে ৬১ জন আহত ও ৮জনকে আটক করা হয়েছে।
এছাড়া এ মাসে মত প্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এমাসে অন্তত ৮ টি ঘটনায় ১০ জনকে আটক ও ৮ টি মামলা দায়ের হয়েছে। এসব মামলায় অন্তত ১১ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে সমালোচনায় ২জন, রাজনৈতিক ও অন্যান্য কন্টেন্ট তৈরি ১ জন, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও কটুক্তির অভিযোগে ২ জন এবং অন্যান্য ইস্যুতে ৬ জনকে আটক করা হয়েছে। অন্যদিকে সাইবার সুরক্ষা আইন-২০২৬-এর বিভিন্ন ধারার অধীনে পৃথক ৪ টি মামলায় ৫ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে, এসব ঘটনায় ৫ জনকে আটকও করা হয়েছে।
কারাগারে মৃত্যুর বিষয়ে সংস্থাটির পক্ষ থেকে উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, এ মাসে সারাদেশে কারাগারে কমপক্ষে ৬ জন আসামী মারা গিয়েছেন । এর মধ্যে ১ জন জন কয়েদী ও ৫ জন হাজতী। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের ১ জন ও ৫ জন জন্য সাধারণ কয়েদী ছিলেন।
সারাদেশ নদী, খাল, জঙ্গল ও পরিত্যক্ত স্থানে দুর্বৃত্তদের হাতে পরিকল্পিত বা অপরিকল্পিতভাবে হতাহতের বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, আগস্ট মাসে সারাদেশ নদী, খাল, জঙ্গল ও পরিত্যক্ত স্থানে দুর্বৃত্তদের হাতে পরিকল্পিত বা অপরিকল্পিতভাবে হত্যাকাণ্ডের ৮২ টি ঘটনায় ৮৭ টি লাশ উদ্ধার হয়েছে। এর মধ্যে বস্তাবন্দি অবস্থায় ১২ টি, ঝুলন্ত অবস্থায় ১৭ টি, শরীরে একাধিক আঘাতসহ ২৬ টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া গলা কেটে হত্যা ৯ টি, হাত-পা বাঁধা ৮ টি লাশ পাওয়া গেছে। এর বাইরে নানা ধরণের পরিস্থিতিতে আরও ১৫ টি লাশ পাওয়া গেছে।
সীমান্তে হতাহত ও আটকের ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে এইচআরএসএসের প্রতিবেদনা বলা হয়, আগস্ট মাসে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ৮ টি ঘটনায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) হামলায় নিহত হয়েছেন ২ জন এবং আহত হয়েছেন ১ জন, যাদের মধ্যে গুলিবিদ্ধ হয়ে হয়েছেন ৩ জন। সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে ৫ জনকে আটক করা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন সিমান্ত দিয়ে ৫ জনকে পুশইন এবং ১৮ জনকে পুশইনের চেষ্টা করা হয়েছে।
অপরদিকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে পুতে রাখা স্থলমাইন বিষ্ফোরনে একজন বাংলাদেশী যুবক নিহত, ১ জন আহত ও ৩ জনকে জলসীমা থেকে আটক হয়েছে।
শ্রমিক নির্যাতনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয় উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগস্ট মাসে অন্তত ৮৪ টি শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৯ জন, আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৬৭ জন। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং শ্রমিকদের সুরক্ষামূলক সরঞ্জামের অভাবে দুর্ঘটনায় অন্তত ৬৩ জন শ্রমিক তাদের কর্মক্ষেত্রে মারা গেছেন। এছাড়া পৃথক দুইটি ঘটনায় ২ জন গৃহকর্মীর মৃত্যু ও ১ জন নির্যাতনের শিকার হয়েছে।
এ মাসে ২৪৯ জন নারী ও কন্যা শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, আগস্ট মাসে কমপক্ষে ২৪৯ জন নারী ও কন্যা শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন অন্তত ৭৯ জন, যাদের মধ্যে ৪৬ (৫৮%) জন ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু ও কিশোরী। এটা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় যে, ১৮ জন নারী ও কন্যা শিশু গণধর্ষনের শিকার হয়েছেন । অন্যদিকে ৯৩ জন নারী ও কন্যা শিশু যৌন নিপীড়ণের শিকার হয়েছেন তন্মধ্যে শিশু ৩৮ জন। যৌতুকের জন্য নির্যাতনের ঘটনায় নিহত ৬ জন, আহত হয়েছেন ৭ জন নারী এবং ১ জন আত্মহত্যা করেছেন। পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন ৪৯ জন, আহত হয়েছেন ৩১ জন এবং আত্মহত্যা করেছেন ২৩ জন নারী।
অন্যদিকে, অন্যদিকে, এটি উদ্বেগজনক যে, ২৮২ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন যাদের মধ্যে ৭৭ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং ২০৫ জন শিশু শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
সার্বিক বিষয়ে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, এ মাসে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি একটি সংবেদনশীল ও পরিবর্তনশীল পর্যায় অতিক্রম করেছে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতা, জাতীয় সংসদকে ঘিরে বিতর্ক এবং জননিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে সার্বিক পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক রূপ ধারণ করেছে।
তিনি আরও বলেন, মাসজুড়ে রাজনৈতিক সহিংসতা, বিশেষ করে ক্যাম্পাসে সহিংসতা, গণপিটুনী ও মব সহিংসতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, সাংবাদিক নির্যাতন, নারী ও শিশু নির্যাতন, সীমান্তে সহিংসতা, শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনা উদ্বেগজনকহারে ঘটেছে। তবে এ মাসে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মতামত প্রকাশকে কেন্দ্র করে গ্রেফতার, হয়রানি ও আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এসব বিষয় সমাধান করা না হলে মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে।
এসময় সরকারের প্রতি মানবাধিকার রক্ষায় আরও জবাবদিহিমূলক ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানানোর পাশাপাশি সকল নাগরিক, গণমাধ্যমকর্মী, নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার সংগঠনের প্রতি এইচআরএসএসের পক্ষ থেকে অধিক সোচ্চার ও সক্রিয় ভূমিকা পালনের অনুরোধ জানান তিনি।
ধন্যবাদসহ
ইজাজুল ইসলাম
নির্বাহী পরিচালক
হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)


