লন্ডন: বাংলাদেশের গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, জবাবদিহিতা, মানবাধিকার এবং রাষ্ট্র সংস্কারের দাবিকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরার লক্ষ্যে ইউরোপজুড়ে ধারাবাহিক গণসংযোগ ও অ্যাডভোকেসি কার্যক্রম পরিচালনা করছে Inqilab Moncho UK। সংগঠনটির চার মাসব্যাপী কর্মসূচি “March for Insaf – Europe”-এর অংশ হিসেবে ইউরোপের বিভিন্ন শহরে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে মতবিনিময়ের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠানের কাছে বাংলাদেশের পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়েছে।
কর্মসূচির অংশ হিসেবে ফ্রান্সের প্যারিস, সুইজারল্যান্ডের জেনেভা, ইতালির মিলান ও তুরিন এবং বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে গণসংযোগ ও মতবিনিময় অনুষ্ঠিত হয়। পরবর্তী পর্যায়ে আবারও প্যারিসে কর্মসূচি পরিচালনা করা হয়। এসব আয়োজনে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, জনগণের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা, মানবাধিকার, জবাবদিহিতা এবং সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়।
‘March for Insaf – Europe’-এর তিন প্রধান দাবি
ইনকিলাব মঞ্চ ইউকে জানিয়েছে, চলমান কর্মসূচির কেন্দ্রে রয়েছে তিনটি প্রধান দাবি। প্রথমত, শহিদ শরীফ ওসমান হাদি হত্যার পূর্ণাঙ্গ, স্বাধীন ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় এনে দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর গণভোটে সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের বিষয়ে জনগণ যে রায় দিয়েছে, সংগঠনটির ভাষ্য অনুযায়ী সেই রায়ের পূর্ণাঙ্গ, যথাযথ ও সময়বদ্ধ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। তৃতীয়ত, জনগণের অধিকার, জবাবদিহিতা, ন্যায়বিচার ও কার্যকর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার কার্যকর করা।
জেনেভায় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার কাছে লিখিত বক্তব্য
ইউরোপ সফরের দ্বিতীয় দিনে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর—Office of the United Nations High Commissioner for Human Rights (OHCHR)—এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন OMCT ও FIDH-এর কাছে লিখিতভাবে সংগঠনের উদ্বেগ ও দাবিগুলো তুলে ধরা হয়।
ইনকিলাব মঞ্চ ইউকের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এসব লিখিত বক্তব্যে বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ, গুম, নির্যাতন, নির্বিচার আটক এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং মানবাধিকার সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক মহলের কার্যকর ভূমিকার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরা হয়।
ব্রাসেলসে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে চিঠি
সফরের চতুর্থ দিনে বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের Subcommittee on Human Rights (DROI) এবং Committee on Foreign Affairs (AFET)-এর চেয়ারম্যান, সদস্য ও সংশ্লিষ্ট সচিবালয়ের উদ্দেশ্যে একটি লিখিত বক্তব্য ও চিঠি হস্তান্তর করা হয়।
সংগঠনটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চেয়ারম্যানদের পক্ষে DROI ও AFET-এর ভাইস-চেয়ার Isabel Serra Sánchez চিঠিটি গ্রহণ করেন। পাশাপাশি ইউরোপীয় পার্লামেন্টের Delegation for Relations with the Countries of South Asia (DSAS)-এর চেয়ারম্যান Şerban-Dimitrie Sturdza-এর উদ্দেশ্যেও পৃথক একটি চিঠি দেওয়া হয়। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সম্পর্কের কাঠামোর মধ্যে বাংলাদেশও রয়েছে।
ইনকিলাব মঞ্চ ইউকের দাবি, সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো তাদের ইউরোপ সফরের উদ্দেশ্য ও লিখিত বক্তব্য গ্রহণ ও নথিভুক্ত করেছে এবং বাংলাদেশে সুশাসন, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও জবাবদিহিতার বিষয়ে ভবিষ্যতে আরও আলোচনার ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
ইউরোপীয় পার্লামেন্টে দেওয়া লিখিত বক্তব্যে জুলাই ২০২৪-এর আন্দোলনের সময় এবং তার পূর্ববর্তী সময়ে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের জবাবদিহিতা, নির্যাতন, গুম ও নির্বিচার আটকের অভিযোগ, ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের সুরক্ষা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
‘প্রতিহিংসা নয়, লক্ষ্য ন্যায়বিচার’
ইনকিলাব মঞ্চ ইউকে বলেছে, তাদের এই উদ্যোগ কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কর্মসূচি নয়। বরং বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া, ন্যায়বিচার এবং ভুক্তভোগীদের অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এটি একটি শান্তিপূর্ণ ও প্রমাণভিত্তিক আন্তর্জাতিক অ্যাডভোকেসি কার্যক্রম।
সংগঠনটি মনে করে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় সংকটের টেকসই সমাধানের জন্য শুধু সরকার পরিবর্তন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন এমন সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, যা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে আরও জবাবদিহিমূলক করবে, আইনের শাসন সুসংহত করবে এবং জনগণের মৌলিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার সুরক্ষিত রাখবে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কার্যক্রম বিস্তারের পরিকল্পনা
বাংলাদেশের জনগণের অধিকার, গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা ও ন্যায়বিচারের দাবিকে প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা, নীতিনির্ধারক এবং সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের কাছে পৌঁছে দিতে বিশ্বের আরও বিভিন্ন দেশে সাংগঠনিক ও অ্যাডভোকেসি কার্যক্রম বিস্তারের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে ইনকিলাব মঞ্চ।
সংগঠনটির প্রত্যাশা, জনগণের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার প্রতি সম্মান, আইনের শাসন ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা এবং কার্যকর সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে বাংলাদেশে একটি ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে।






