ঢাকা | ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর কয়েকটি অস্পষ্ট ও অতিরিক্ত বিস্তৃত বিধান নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)। সংগঠনটির আশঙ্কা, প্রস্তাবিত আইনটি বর্তমান রূপে চূড়ান্ত হলে সাইবার অপরাধ প্রতিরোধের পরিবর্তে মতপ্রকাশ নিয়ন্ত্রণ, সাংবাদিক হয়রানি এবং ভিন্নমত দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সংগঠনটি বিতর্কিত ধারাগুলো প্রত্যাহার বা সংশোধন এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার সুরক্ষার আহ্বান জানিয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে এইচআরএসএস জানায়, অনলাইন হয়রানি, ব্ল্যাকমেলিং, সেক্সটরশন, রিভেঞ্জ পর্নোগ্রাফি, শিশু নিপীড়ন, পরিচয় চুরি ও ডিজিটাল প্রতারণার মতো অপরাধ মোকাবিলায় কার্যকর আইন প্রয়োজন। তবে সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নামে নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার সংকুচিত করা গ্রহণযোগ্য নয় বলে সংগঠনটি মনে করে।
প্রস্তাবিত সংশোধনীতে গুজব ও অপতথ্য প্রচারের জন্য সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড অথবা ৪০ লাখ টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখার কথা উল্লেখ করে এইচআরএসএস বলেছে, ‘অসমর্থিত’, ‘অযাচাইকৃত’, ‘মিথ্যা’ ও ‘বিভ্রান্তিকর’ তথ্যের সংজ্ঞা যথেষ্ট স্পষ্ট নয়। কোনো তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা সম্ভব না হওয়া এবং সেটি মিথ্যা প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। এ ধরনের অস্পষ্ট সংজ্ঞা অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে।
সংগঠনটি আরও জানায়, প্রস্তাবিত সংশোধনীতে মানহানি, হেয়প্রতিপন্নকরণ ও বুলিংকে নারী ও শিশু সুরক্ষাসংক্রান্ত ধারার সঙ্গে যুক্ত করে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড অথবা ২০ লাখ টাকা জরিমানার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে রাজনৈতিক সমালোচনা, ব্যঙ্গচিত্র, সম্পাদকীয় কার্টুন, প্রতিবাদী স্লোগান কিংবা সরকারের সমালোচনামূলক বক্তব্যকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
একইভাবে প্রস্তাবিত ধারা ২৭ অনুযায়ী, কোনো কনটেন্ট শেয়ার করাকেও প্রচার হিসেবে গণ্য করা এবং অপরাধে সহায়তার শাস্তি মূল অপরাধের সমান করার প্রস্তাব নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে সংগঠনটি। এইচআরএসএসের মতে, কনটেন্ট নির্মাতা ও শেয়ারকারীর দায় নির্ধারণের ক্ষেত্রে উদ্দেশ্য, অপরাধ সম্পর্কে জ্ঞান, ক্ষতির মাত্রা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ভূমিকা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। মিম, প্যারোডি, কার্টুন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে তৈরি কনটেন্টের জন্যও জনস্বার্থভিত্তিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে তারা।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিচারিক অনুমোদন ছাড়া অনলাইন কনটেন্ট ব্লক করার ক্ষমতা সম্প্রসারণ এবং কোনো প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন বা লাইসেন্স বাতিলের প্রস্তাব নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। সংগঠনটির মতে, এসব ক্ষমতা সংবাদমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ওপর প্রশাসনিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তাই কনটেন্ট অপসারণ বা প্রতিষ্ঠান বন্ধের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে স্বাধীন বিচারিক পর্যালোচনা, লিখিত কারণ, নোটিশ এবং কার্যকর আপিলের ব্যবস্থা থাকা জরুরি।
প্রস্তাবিত জাতীয় সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিলের স্বাধীনতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে এইচআরএসএস। কাউন্সিলে প্রধানমন্ত্রীকে প্রধান এবং মন্ত্রী ও সরকারি কর্মকর্তাদের সদস্য করার পাশাপাশি বেসরকারি বিশেষজ্ঞদের সরকার কর্তৃক মনোনয়নের প্রস্তাব এর নিরপেক্ষতা ও স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে বলে সংগঠনটি জানিয়েছে। কাউন্সিলে সাংবাদিকতা, তথ্যপ্রযুক্তি, আইন ও মানবাধিকার বিষয়ে স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছে তারা।
সংগঠনটি স্মরণ করিয়ে দেয়, অতীতে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এবং সাইবার নিরাপত্তা আইনের বিভিন্ন ধারার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছিল। এসব আইনে সাংবাদিক, লেখক, শিক্ষার্থী ও মানবাধিকারকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা এবং গ্রেপ্তারের ঘটনাও ঘটেছে। কারাগারে লেখক মুশতাক আহমেদের মৃত্যুর ঘটনাও বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।
সরকারের কাছে নয় দফা দাবি তুলে ধরে এইচআরএসএস গুজব ও অপতথ্যসংক্রান্ত ধারা পুনর্বিবেচনা বা প্রত্যাহার, অস্পষ্ট শব্দের সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা নির্ধারণ, মানহানিকে নারী ও শিশু সুরক্ষার ধারা থেকে পৃথক করা এবং সাংবাদিকতা, রাজনৈতিক সমালোচনা ও জনস্বার্থে মতপ্রকাশের জন্য সুস্পষ্ট আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে।
পাশাপাশি কনটেন্ট ব্লকের আগে বিচারিক অনুমোদন, স্বাধীন আদালতে আপিলের সুযোগ, সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিলের নিরপেক্ষতা এবং বেআইনি গ্রেপ্তার বা ক্ষমতার অপব্যবহারের শিকার নাগরিকদের জন্য ক্ষতিপূরণ ও কার্যকর প্রতিকারের ব্যবস্থা রাখার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
আইনটি চূড়ান্ত করার আগে সাংবাদিক সংগঠন, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান, আইনজীবী, প্রযুক্তিবিদ, শিক্ষাবিদ ও নাগরিক সমাজের সঙ্গে উন্মুক্ত ও অর্থবহ পরামর্শের আহ্বান জানিয়ে এইচআরএসএস বলেছে, প্রস্তাবিত সংশোধনীকে সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে।
সংগঠনটির বক্তব্য, সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং নাগরিকের কার্যকর আইনি প্রতিকার নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত সংশোধিত আইনের মূল লক্ষ্য।


