রাজধানীতে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, লুটপাট, ভাঙচুর ও স্থাপনা ধ্বংস এবং কনটেন্ট নির্মাতা সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) গভীর উদ্বেগ ও তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে।
এইচআরএসএস মনে করে, এসব ঘটনা শুধু ফৌজদারি অপরাধের বিষয় নয়; এগুলো জীবন ও নিরাপত্তার অধিকার, স্বাস্থ্যসেবার অধিকার, সম্পত্তির অধিকার, ব্যক্তিগত মর্যাদা, পেশাগতভাবে কাজ করার স্বাধীনতা এবং আইনের শাসনের ওপর গুরুতর আঘাত।
রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা মানবাধিকারের ওপর গুরুতর আঘাত
মিরপুর-১-এর রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে মধ্যরাতে দুই শতাধিক মুখোশধারী ব্যক্তি হামলা চালিয়ে নিরাপত্তাকর্মীদের জিম্মি ও মারধর, স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ওষুধ, সরকারি টিকা, টিকাদান-সংক্রান্ত রেজিস্টার ও নথিপত্র, পরিবার পরিকল্পনা সামগ্রী, চিকিৎসা সরঞ্জামসহ বিভিন্ন মালামাল লুট এবং পরে ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে একটি স্থায়ী ও তিনটি সেমিপাকা ভবন ধ্বংস করেছে বলে মামলা ও গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি অনুযায়ী ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় দেড় কোটি টাকা।
রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি দীর্ঘদিন ধরে বিশেষ করে নিম্ন আয়ের ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী, নারী ও শিশুদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, মাতৃস্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা এবং টিকাদান সেবা দিয়ে আসছিল। ফলে একটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানকে হামলা ও ধ্বংসের মাধ্যমে অকার্যকর করে দেওয়া কেবল একটি ভবন বা সম্পত্তির ক্ষতি নয়—এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকার এবং জীবন রক্ষার ওপর।
বিশেষভাবে উদ্বেগজনক হলো, হামলায় সরকারি টিকা এবং টিকাদান-সংক্রান্ত রেজিস্টার ও নথিপত্র লুট বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ। স্বাস্থ্য-নথি ও টিকা সংক্রান্ত তথ্যের ক্ষতি হলে শিশুদের টিকাদান কার্যক্রম, পরবর্তী ডোজ নিশ্চিতকরণ এবং জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই এ ঘটনাকে নিছক জমি বা স্থাপনা-সংক্রান্ত বিরোধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এর সঙ্গে জনস্বাস্থ্য ও জনগণের মৌলিক অধিকার সরাসরি সংশ্লিষ্ট।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও স্বচ্ছ তদন্ত প্রয়োজন
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, বিভিন্ন প্রতিবেদনে হামলার সময় ঘটনাস্থলে পুলিশের উপস্থিতি এবং পুলিশের সামনে লুটপাটের অভিযোগ উঠে এসেছে। সিসিটিভি ফুটেজে পুলিশের গাড়ি ঘটনাস্থলের কাছে থাকার সময়ও মালামাল পিকআপে তোলার দৃশ্য দেখা গেছে বলে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
এইচআরএসএস মনে করে, শুধু হামলাকারীদের শনাক্ত করাই যথেষ্ট নয়। পুলিশ কখন ঘটনাটি সম্পর্কে জানতে পেরেছে, কখন ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে, কেন হামলা ও ধ্বংসযজ্ঞ প্রতিরোধ করা যায়নি এবং ঘটনাস্থলে উপস্থিত পুলিশ সদস্যরা কী ভূমিকা পালন করেছেন—এসব প্রশ্নের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। দায়িত্ব পালনে অবহেলা বা যোগসাজশের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।
সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলাও নিন্দনীয়
একই সময়ে রাজধানীর ইসিবি চত্বর এলাকায় কনটেন্ট নির্মাতা সালমান মুক্তাদিরের ‘ব্রাউনফিশ’ স্টুডিওতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনাতেও এইচআরএসএস তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সংঘবদ্ধ একটি দল স্টুডিওতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও মালামাল লুট করে এবং সেখানে থাকা ব্যক্তিদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ রয়েছে। ঘটনার প্রকৃত কারণ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা জরুরি।
এইচআরএসএস সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে নিম্নলিখিত দাবি জানাচ্ছে—
১. রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, লুটপাট ও ধ্বংসযজ্ঞের পূর্ণাঙ্গ, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত করতে হবে।
২. হামলার সঙ্গে জড়িত প্রত্যক্ষ ব্যক্তিদের পাশাপাশি পরিকল্পনাকারী, নির্দেশদাতা, অর্থদাতা ও সহযোগীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
৩. সরকারি টিকা, স্বাস্থ্য-নথি, EPI রেজিস্টার, ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম উদ্ধার এবং সেগুলোর নিরাপত্তা ও ব্যবহারযোগ্যতা যাচাই করতে হবে।
৪. ক্ষতিগ্রস্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্র দ্রুত পুনঃস্থাপন করে স্বাস্থ্যসেবা চালু করতে হবে এবং সেবা থেকে বঞ্চিত জনগণের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন বিকল্প স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা করতে হবে।
৫. ঘটনাস্থলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা সম্পর্কে স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক তদন্ত করতে হবে। দায়িত্বে অবহেলা বা যোগসাজশ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে।
৬. সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলার ঘটনায়ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত কারণ ও জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।
৭. কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা প্রভাবশালী মহল যেন আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে দখল, হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
৮. স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, চিকিৎসাকর্মী, স্বাস্থ্যকর্মী, রোগী এবং সাধারণ নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা ও জবাবদিহিমূলক আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
এইচআরএসএস বিশেষভাবে স্মরণ করিয়ে দিতে চায়—স্বাস্থ্যসেবা কোনো রাজনৈতিক, ব্যবসায়িক বা স্থানীয় প্রভাবের বিষয় নয়; এটি মানুষের মৌলিক অধিকার ও জনকল্যাণের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ধ্বংসের অর্থ শুধু একটি ভবন ধ্বংস নয়; এর মাধ্যমে অসংখ্য মানুষের চিকিৎসা, টিকাদান, মাতৃস্বাস্থ্য ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবা বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
অতএব, রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ঘটনায় দায়ীদের বিচার, ক্ষতিগ্রস্ত স্বাস্থ্যসেবা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য এইচআরএসএস জোর দাবি জানাচ্ছে।
Home বাংলাদেশ রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা-লুটপাট ও ধ্বংস এবং সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা: এইচআরএসএসের তীব্র...


