কৈশোর শেষ হয় কখন—আঠারোয়, নাকি কুড়ির ঘরে? কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণা এই পরিচিত প্রশ্নকে নতুন আলোয় দেখিয়েছে। গবেষকদের বিশ্লেষণে, মস্তিষ্কের স্নায়বিক সংযোগের বিন্যাসে কৈশোরসদৃশ বিকাশের একটি পর্যায় গড়ে প্রায় ৩২ বছর বয়স পর্যন্ত চলতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে ত্রিশ বছরের একজন মানুষ আচরণ, দায়িত্ববোধ বা সামাজিক অবস্থানের বিচারে কিশোর। এখানে ‘কৈশোর’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে মস্তিষ্কের গঠনগত পরিবর্তনের একটি পর্যায় বোঝাতে।
২০২৫ সালের ২৫ নভেম্বর নেচার কমিউনিকেশনস সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণাটিতে জন্ম থেকে ৯০ বছর বয়স পর্যন্ত মানুষের মস্তিষ্কের সংযোগব্যবস্থা বিশ্লেষণ করা হয়। মূল বিশ্লেষণে ছিলেন ৩,৮০২ জন। গবেষকেরা ডিফিউশন এমআরআইয়ের তথ্য ব্যবহার করেছেন—এই পদ্ধতিতে মস্তিষ্কের টিস্যুর ভেতর পানির অণুর চলাচল পর্যবেক্ষণ করে স্নায়ুতন্তুর সংযোগ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
আমাদের মস্তিষ্কের বিভিন্ন অঞ্চল পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ করে একটি জটিল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে। বয়স বাড়ার সঙ্গে এই নেটওয়ার্কের সংগঠনও বদলায়। গবেষণায় প্রায় ৯, ৩২, ৬৬ ও ৮৩ বছর বয়সে পরিবর্তনের গতিপথে চারটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক শনাক্ত হয়েছে। এগুলোর ভিত্তিতে গবেষকেরা মস্তিষ্কের জীবনকালকে পাঁচটি বিস্তৃত পর্যায়ে ভাগ করেছেন।
জন্ম থেকে প্রায় নয় বছর পর্যন্ত প্রথম পর্যায়টি শৈশবের। এরপর শুরু হয় কৈশোরসদৃশ বিকাশের দীর্ঘ পর্ব, যা প্রায় ৩২ বছর পর্যন্ত বিস্তৃত। এই সময়ে মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের মধ্যে যোগাযোগের সংগঠন আরও পরিশীলিত হয়। প্রায় ৩২ থেকে ৬৬ বছর পর্যন্ত থাকে তুলনামূলক স্থিতিশীল প্রাপ্তবয়স্ক পর্যায়। এরপর ৬৬ থেকে ৮৩ বছরকে প্রাথমিক বার্ধক্য এবং ৮৩ বছরের পরের সময়কে পরবর্তী বার্ধক্যের পর্যায় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলো গড় প্রবণতার আনুমানিক সীমানা।
এই ফল বোঝার ক্ষেত্রে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার: মস্তিষ্কের সংযোগের বিন্যাস, মানুষের মানসিক পরিপক্বতা এবং দৈনন্দিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এক জিনিস নয়। গবেষণাটি কোনো ব্যক্তির জন্য ‘প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার জন্মদিন’ নির্ধারণ করেনি। ফলে ৩২ বছর বয়সকে সবার পরিপক্বতার নির্দিষ্ট সীমা ধরে নেওয়া এই ফলের অতিরঞ্জিত ব্যাখ্যা হবে।
গবেষণার পদ্ধতিতেও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। একই মানুষকে জন্ম থেকে বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত অনুসরণ করার বদলে এখানে বিভিন্ন বয়সের মানুষের তথ্য তুলনা করা হয়েছে। তাই ফলটি জনসমষ্টির মধ্যে বয়সভিত্তিক প্রবণতা তুলে ধরে; একজন মানুষের মস্তিষ্ক ঠিক কীভাবে বদলাবে, তা নিশ্চিত করে বলে না।
তবু গবেষণাটি গুরুত্বপূর্ণ। মস্তিষ্কের বিকাশকে একটানা সরল প্রক্রিয়া হিসেবে দেখার বদলে এটি বিভিন্ন পর্যায়ের পরিবর্তন বোঝার একটি কাঠামো দিয়েছে। গবেষকদের মতে, এই কাঠামো ভবিষ্যতে শৈশবের শেখার সমস্যা কিংবা বৃদ্ধ বয়সের ডিমেনশিয়ার মতো বিষয় বোঝার গবেষণায় সহায়ক হতে পারে। এটি এখনই রোগ নির্ণয়ের কোনো নতুন পরীক্ষা নয়।
‘কৈশোর ত্রিশের ঘর পর্যন্ত চলে’—শিরোনামটি তাই কৌতূহল জাগালেও এর বৈজ্ঞানিক অর্থ আরও নির্দিষ্ট। মানুষের মস্তিষ্কের বিকাশ দীর্ঘ, জটিল এবং পর্যায়ভিত্তিক। বয়সের সংখ্যা আমাদের জীবনকে চিহ্নিত করে; মস্তিষ্কের পরিবর্তনের পুরো গল্পটি সেই সংখ্যার চেয়ে অনেক সমৃদ্ধ।






