বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন কেবল একজন ক্ষমতাসীন বা বিরোধী নেত্রী নন—তিনি ছিলেন সময়ের সাক্ষী, সংগ্রামের প্রতীক এবং গণতন্ত্রের এক অবিচল অভিভাবক। একজন সাধারণ গৃহবধূ থেকে তিনবারের প্রধানমন্ত্রী হয়ে ওঠার এই দীর্ঘ যাত্রা ছিল ত্যাগ, বিশ্বাস, ধৈর্য ও আত্মমর্যাদার এক বিরল মহাকাব্য। আজ ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর ভোরে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে তাঁর ইন্তেকালের মধ্য দিয়ে একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটলেও, তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শ, সংগ্রাম ও আত্মত্যাগ বাংলাদেশের রাজনীতিতে চিরকাল জীবিত থাকবে।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ৬ আগস্ট নির্বাহী আদেশে মুক্তি পান বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। দীর্ঘ কারাবাস, গুরুতর অসুস্থতা ও রাজনৈতিক নিপীড়নের পর ৭ আগস্ট রাজধানীর নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে ভার্চুয়ালি দেওয়া তাঁর প্রথম বক্তব্য ছিল রাষ্ট্রনায়কোচিত সংযম ও প্রজ্ঞার অনন্য দৃষ্টান্ত। তিনি বলেছিলেন, “ধ্বংস নয়, প্রতিশোধ নয়, প্রতিহিংসা নয়। আসুন ভালোবাসা, শান্তি ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলি।” ক্ষমতাচ্যুত সরকারের বিরুদ্ধে সীমাহীন নির্যাতনের শিকার হয়েও তাঁর কণ্ঠে প্রতিশোধের ভাষা ছিল না; ছিল শান্তি, সাম্য ও মানবিক রাষ্ট্র নির্মাণের আহ্বান। তিনি সকল ধর্ম ও গোষ্ঠীর অধিকার নিশ্চিত করে তরুণদের নেতৃত্বে একটি জ্ঞানভিত্তিক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার স্বপ্নের কথা বলে গেছেন।
বাংলাদেশে গণতন্ত্রের জন্য খালেদা জিয়ার ত্যাগ ছিল সীমাহীন। এরশাদের সময় স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্বে তাঁকে কারাবন্দি করা হয়েছে, রাষ্ট্রীয়ভাবে হেয় করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার তাঁকে নিজ বাসভবন থেকে উচ্ছেদ করেছে। বিগত সরকারের সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে চালানো হয়েছে অশালীন, ন্যাক্কারজনক কটুক্তি ও চরিত্রহননের সংগঠিত অপচেষ্টা। তবুও তিনি ছিলেন অবিচল, ধীর ও সংযত। প্রতিশোধের রাজনীতি নয়, তিনি বেছে নিয়েছিলেন নৈতিক শক্তি ও ধৈর্যের পথ। একাধিকবার তিনি বলেছেন, “আমি প্রতিশোধে বিশ্বাসী নই, আল্লাহই ন্যায়বিচার করবেন।” এই বিশ্বাসই তাঁকে দীর্ঘ নিপীড়নের মধ্যেও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি দিয়েছে।
এই সংগ্রামের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক অধ্যায় ছিল একজন মায়ের ত্যাগ। তিনি হারিয়েছেন তাঁর প্রিয় সন্তান আরাফাত রহমান কোকোকে। একজন মায়ের জন্য এ শোক ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। ব্যক্তিগত বেদনার এই পাহাড়সম ভার বয়ে নিয়েও তিনি দেশের গণতান্ত্রিক লড়াই থেকে এক মুহূর্তের জন্যও সরে যাননি। কারাবন্দি অবস্থায় তাঁর মুক্তি ও রোগমুক্তির জন্য দেশবাসীর দোয়ার কথা স্মরণ করে তিনি কৃতজ্ঞচিত্তে বলেছিলেন, “দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর আপনাদের সামনে কথা বলতে পারার জন্য আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করছি।” তাঁর রাজনীতি ও ব্যক্তিজীবনের মূল শক্তি ছিল ইসলামের প্রতি গভীর বিশ্বাস। ধর্মকে তিনি কখনো রাজনৈতিক হাতিয়ার বানাননি; বরং নৈতিকতা, সহনশীলতা, মানবিকতা ও আত্মশুদ্ধির ভিত্তি হিসেবে ধারণ করেছেন।
চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে যাওয়ার অবারিত সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি দীর্ঘ সময় দেশ ছাড়তে রাজি হননি। গুরুতর অসুস্থ শরীর নিয়েও তিনি দেশের মাটিতেই থাকতে চেয়েছেন। তাঁর কথায় বারবার ফিরে এসেছে গভীর দেশপ্রেমের ঘোষণা—“এই দেশের মাটিতেই আমার জন্ম, এখানেই যদি মৃত্যু হয়, তাতেই আমি শান্তি পাব।” শেষ পর্যন্ত ফজরের ঠিক পরপরই, এই দেশের মাটিতেই তিনি ইন্তেকাল করেন—যেন নিজের উচ্চারিত কথাকেই সত্য করে গেলেন।
রাষ্ট্রীয় নীতি ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে খালেদা জিয়া ছিলেন আপসহীন। ভারত নীতিতে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল শেখ হাসিনার থেকে স্পষ্টভাবে ভিন্ন। তিনি সর্বদা বাংলাদেশের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলনেতা হিসেবে ভারতের জন্য উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহারের অনুমতি দিতে তিনি অস্বীকৃতি জানান এবং ভারতের ট্রাক বাংলাদেশের সড়ক ব্যবহারের বিষয়টিকে ‘দাসত্বের’ সঙ্গে তুলনা করেন। ১৯৭২ সালের ভারত-বাংলাদেশ বন্ধুত্ব চুক্তির নবায়নের বিরোধিতা, ফারাক্কা ব্যারেজের কারণে বাংলাদেশের পানিবঞ্চনার কড়া সমালোচনা এবং চীনের সঙ্গে কৌশলগত প্রতিরক্ষা চুক্তি—সব মিলিয়ে তাঁর নীতি ছিল জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক, আত্মমর্যাদাশীল ও বাস্তবমুখী। ভারতীয় গণমাধ্যম এনডিটিভি তাঁর মৃত্যুর পর লিখেছে, বিএনপিকে বাংলাদেশের স্বার্থের রক্ষক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে খালেদা জিয়া তাঁর নীতিকে ভারতের আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন।
ধর্মীয় শিক্ষা ও মাদ্রাসা ব্যবস্থার উন্নয়ন ও স্বীকৃতিতেও তাঁর ভূমিকা ছিল আপসহীন ও ঐতিহাসিক। কওমি ও আলিয়া মাদ্রাসা শিক্ষাকে জাতীয় মূলধারার সঙ্গে সংযুক্ত করা, ধর্মীয় শিক্ষার্থীদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও মর্যাদা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তিনি দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল—নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষার সঙ্গে আধুনিক জ্ঞানের সমন্বয়ই একটি সুস্থ ও মানবিক রাষ্ট্র গঠনের ভিত্তি।
আজ ভোর ৬টায় এভারকেয়ার হাসপাতালে তাঁর মৃত্যুর খবরে কান্নায় ভেঙে পড়েন চিকিৎসক, নার্স ও হাসপাতালের স্টাফরা। লিভার, কিডনি, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও নিউমোনিয়াসহ নানা জটিল রোগে ভুগছিলেন তিনি। বিএনপির ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে জানানো হয়, “দেশনেত্রী খালেদা জিয়া ফজরের ঠিক পরে ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।”
বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব, ইসলামী মূল্যবোধে অবিচল থাকা এবং জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দৃঢ় অবস্থানের জন্য খালেদা জিয়া ইতিহাসে অমলিন হয়ে থাকবেন। তিনি ছিলেন এমন এক নারী রাষ্ট্রনায়ক, যিনি কখনো কোনো নির্বাচনে পরাজয়ের লজ্জা বহন করেননি, বরং প্রতিটি পর্বে জনগণের আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। প্রতিশোধ নয়, শান্তির যে বার্তা তিনি রেখে গেছেন—তা কেবল একটি রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, বরং একটি রাষ্ট্রনায়কোচিত জীবনের চূড়ান্ত শিক্ষা, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে পথ দেখিয়ে যাবে।
সুমন মাহমুদ
লেখক, গবেষক ও টিভি উপস্থাপক




