(আমেরিকার ১১তম দিন)
মো: আব্দুল মুনিম জাহেদী ক্যারল
আমার আমেরিকার মিশিগান সফরের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল প্রিয় ফুফাতো বোন ডা. মালেকা বেগমের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা। কিছুদিন আগে তাঁর জীবনে নেমে আসে এক গভীর শোকাবহ সময়—মাত্র ছয়-সাত মাসের ব্যবধানে তিনি হারিয়েছেন তাঁর প্রিয় স্বামী ও বড় ছেলেকে। এই কঠিন সময়ে তাঁর পাশে দাঁড়ানো, সমবেদনা জানানো এবং কিছুটা সময় একসঙ্গে কাটানোর উদ্দেশ্যেই আমি তাঁর কাছে যাই।
সাক্ষাতের পূর্বে আমার দ্বিতীয় ভাগনা শাহী এবং আরেক ভাগনা জয়নালকে সঙ্গে নিয়ে মিশিগানের একটি প্রাচীন মসজিদে মাগরিবের নামাজ আদায় করি। এরপর আমার দুলাভাই এডভোকেট সুলতানুজ্জামান এবং প্রিয় ভাগনা রুহুল হুদা মুমিনের কবর জিয়ারত করি এবং তাঁদের রূহের মাগফিরাত কামনা করি। মুহূর্তগুলো ছিল অত্যন্ত আবেগঘন ও স্মৃতিময়।
লন্ডন থেকে আমার সফরসঙ্গী ছিলেন মুসলিম কমিউনিটি অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক প্রেসিডেন্ট ও লন্ডন ইস্ট একাডেমির সাবেক প্রিন্সিপাল ড. মুসলেহ উদ্দিন ফারাদী, ইস্ট লন্ডন মসজিদের সাবেক প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান এবং মুসলিম কমিউনিটি অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাহী পরিচালক দিলোয়ার হোসেন খান প্রমুখ।
মালেকা আপার স্বামীর বাড়ি জগন্নাথপুর থানার দাওয়ারাই গ্রামে। সেই গ্রামের অনেক মানুষই বর্তমানে মিশিগানে বসবাস করছেন। ফলে সেখানে গিয়ে অনেকের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ হয়। মালেকা আপার আমন্ত্রণে ভাগনা শাহী’র বাসায় আমাদের রাতের খাবারের আয়োজন করা হয়। বউমাদের আন্তরিক পরিশ্রমে নানা পদের সুস্বাদু খাবার আমাদের পরিবেশন করা হয়—তাঁদের প্রতি জানাই আন্তরিক ধন্যবাদ।
চার ভাগনা চারটি পৃথক বাসায় থাকলেও সবার বাসা পাশাপাশি, এবং সবাই মিলেমিশে আছেন। প্রতিদিন একে অপরের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ হয়—এই বন্ধন সত্যিই হৃদয়স্পর্শী। প্রিয় ভাগনা ও বউমাদের প্রতি আবারও কৃতজ্ঞতা ও শুভকামনা—আল্লাহ আপনাদের সুস্বাস্থ্য ও মঙ্গল দান করুন।
ডা. মালেকা বেগম—যাকে আমরা স্নেহভরে “খানম আপা” বলে ডাকি—আমাদের পারিবারিক পরিমণ্ডলে এক উজ্জ্বল নাম। আমার আব্বার ভাগনা-ভাগনিদের মধ্যে এডভোকেট আজিজুল বারি মলিক ও ডা. মালেকা বেগম ছিলেন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁদের উচ্চশিক্ষা, মেধা ও আদর্শিক জীবন সবসময় আমাদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস ছিল। আব্বা তাঁদের নিয়ে গভীর গর্ব অনুভব করতেন এবং আমাদের সামনে তাঁদের জীবনকে আদর্শ হিসেবে তুলে ধরতেন।
ছোটবেলা থেকেই মালেকা আপাকে আমি একজন আদর্শ মা, স্নেহময়ী বোন, নিবেদিতপ্রাণ স্ত্রী এবং একজন দায়ী ইলাল্লাহ হিসেবে দেখে আসছি। তাঁর জীবনধারা ছিল ইসলামের আদর্শে গড়া—যা তিনি শুধু কথায় নয়, প্রতিটি কাজে বাস্তবায়ন করেছেন।
তিনি সত্যিই এক বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব। একদিকে ইসলামী আন্দোলনের নিবেদিতপ্রাণ কর্মী, অন্যদিকে সফল দাওয়াহ প্রচারক এবং আদর্শ মা। মানুষের মাঝে দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর আন্তরিকতা, ধৈর্য ও প্রজ্ঞা তাঁকে একজন সফল দায়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
একজন চিকিৎসক হিসেবেও তিনি অত্যন্ত সম্মানিত। রোগীদের প্রতি তাঁর সহানুভূতি, দায়িত্ববোধ এবং আন্তরিকতা তাঁকে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। তাঁর কাছে চিকিৎসা কেবল পেশা নয়—এটি ইবাদত, মানবসেবার মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের এক মহৎ মাধ্যম।
লেখক ও সংগঠক হিসেবেও তাঁর অবদান প্রশংসনীয়। ইসলামিক, সামাজিক ও সাংগঠনিক বিভিন্ন বিষয়ে তিনি বহু গ্রন্থ রচনা করেছেন, যা সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তাঁর স্মৃতিচারণমূলক লেখায় পারিবারিক ঐতিহ্য ও মূল্যবোধের প্রতিফলন স্পষ্ট।
পারিবারিক জীবনেও তিনি সমান সফল। চার সন্তানের জননী হিসেবে তাঁদের ইসলামী মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও মানবিক গুণাবলিতে গড়ে তুলেছেন। তাঁর বড় ছেলে রুহুল হুদা মুবিন যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানের ডেট্রয়েট শহরে একজন সফল ব্যবসায়ী, সংগঠক ও সমাজসেবক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। দুর্ভাগ্যবশত, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে তিনি ইন্তেকাল করেন।
দ্বিতীয় ছেলে রুহুল আখলাক শাহী মানবসেবামূলক কেয়ার হোম পরিচালনা করছেন। তৃতীয় ছেলে রুহুল মোমেন শাকির একজন আইন বিশেষজ্ঞ হিসেবে মানুষের কল্যাণে কাজ করছেন। চতুর্থ ছেলে রুহুল সিদ্দিক জাকির ফার্মেসি পরিচালনা করছেন। তাঁরা সবাই পরিশ্রমী, দক্ষ এবং সমাজসেবায় নিয়োজিত।
তাঁদের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত “সেন্টার ফর দাওয়াহ এন্ড রিসার্চ” মিশিগানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইসলামিক প্রতিষ্ঠান, যেখানে নারী-পুরুষ, কিশোর-কিশোরীসহ সকলের জন্য দ্বীনি ও সামাজিক সেবা প্রদান করা হয়।
মালেকা আপা ও তাঁর পরিবারের উদ্যোগে সিলেটের তুড়ুকখলা গ্রামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে “আল আকসা হাফিজিয়া মাদরাসা ও এতিমখানা”। এখানকার ছাত্ররা নিয়মিত হিফজ সম্পন্ন করে কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হচ্ছে—প্রতি বছর ৪/৫ জন হাফিজ তৈরিতে এই মাদরাসার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
মালেকা আপার স্বামী এডভোকেট সুলতানুজ্জামান ছিলেন একজন আদর্শ পিতা ও নিবেদিতপ্রাণ সমাজসেবক। তিনি ছিলেন অত্যন্ত অমায়িক, উদার এবং সাদা মনের মানুষ। ছোট-বড় সকলকে খুব সহজেই আপন করে নেওয়ার অসাধারণ গুণ ছিল তাঁর মধ্যে। জীবনের শেষ বয়স পর্যন্ত মানুষের উপকারে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন।
২০২৪ সালে মিশিগানে তিনি ইন্তেকাল করেন। সারাজীবন তিনি মানবকল্যাণে কাজ করে গেছেন। আমাদের প্রতিও তাঁর ছিল গভীর মমতা ও অকৃত্রিম ভালোবাসা। এবার মিশিগানে গিয়ে তাঁকে গভীরভাবে স্মরণ করেছি—তাঁর অনুপস্থিতি খুব অনুভব করেছি।
দুই বছর আগে বাংলাদেশে একসঙ্গে থাকার সময়ও তিনি অত্যন্ত উদারতার সঙ্গে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। আমার মাধ্যমেই একজন অসহায় মানুষের বাড়ি নির্মাণে সহায়তা করেছিলেন। তাঁর নিজ গ্রাম ও এলাকাতেও রয়েছে অসংখ্য অবদান, যা তাঁকে মানুষের হৃদয়ে চিরস্মরণীয় করে রাখবে।
সম্প্রতি বাবা-ছেলের কবর জিয়ারত করে অন্তরভরে দোয়া করেছি—
মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁদের সকল নেক আমল কবুল করুন এবং জান্নাতের উচ্চ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করুন।
সব মিলিয়ে, ডা. মালেকা বেগম একজন অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব—যিনি নিজের জীবনকে ইসলামের আলোকে সাজিয়ে সমাজে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাঁর কর্মনিষ্ঠা, আত্মত্যাগ এবং দ্বীনের প্রতি ভালোবাসা নিঃসন্দেহে অন্যদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।



